কুরুবংশের রাজকুমার অভিমন্যু মহাভারতের অন্যতম উল্লেখযোগ্য চরিত্র ; যিনি
সততা,নিষ্টা ও সাহসীকতায় চির অমর হয়ে আছেন।রাজকুমার অভিমুন্য মধ্যম পান্ডব
অর্জুন এবং শ্রীকৃষ্ণের ভগ্নী যাদব রাজকুমারী সুভদ্রার পুত্র।সেই দিক থেকে
বীর অভিমুন্য ছিলেন শ্রীকৃষ্ণের ভাগিনেয়।তাছাড়াও তিনি ছিলেন মৎস্য রাজকন্যা উত্তরার স্বামী।অভিমুন্য শৌর্যে বীর্যে ছিলেন তাঁর পিতা অর্জুন ও পিতামহ ইন্দ্রের সমতুল্য।
অর্জুনের বারো বছরের ব্রহ্মচর্য ও বনবাস সম্পূর্ণ হওয়ার সময় অভিমন্যুর
জন্ম হয়। মাতা সুভদ্রার গর্ভে থাকতেই তাঁর শিক্ষা শুরু হয়েছিল।
গর্ভাবস্থায় সুভদ্রা অর্জুনের নিকট চক্রব্যূহে প্রবেশের প্রণালী শুনতে
শুনতে ঘুমিয়ে পড়ায় তিনি আর চক্রব্যূহ হতে বের হওয়ার কৌশল শুনতে পারেন
নি।তাই অভিমন্যু কেবল চক্রব্যূহে প্রবেশ করতে জানতেন, বাহির হতে জানতেন
না।পান্ডবগণের বনবাস ও অজ্ঞাতবাসের কারণে অভিমন্যু তাঁর বাল্যকাল দ্বারকায়
মাতুলালয়ে অতিবাহিত করেন। সেখানে কৃষ্ণ ও বলরামের অভিভাবকত্বে তিনি
কৃষ্ণপুত্র প্রদ্যুম্ন এবং যাদববীর কৃতবর্মা ও সাত্যকীর নিকট অস্ত্রশিক্ষা
গ্রহণ করেন।অজ্ঞাতবাসকালে
পঞ্চপান্ডব ও দ্রৌপদী মৎস্যরাজ বিরাটের নিকট ছদ্মবেশে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
তেরো বৎসর সম্পূর্ণ হওয়ার পর তাঁরা আত্মপ্রকাশ করলে বিরাট স্বীয় কন্যা
উত্তরার সঙ্গে অর্জুনের বিবাহের প্রস্তাব দেন। তখন অর্জুন জানান উত্তরা
তাঁকে আচার্যের ন্যায় শ্রদ্ধা করেন। তাই তিনি উত্তরাকে পুত্রবধূ রূপে
গ্রহণ করবেন। তাঁর পুত্র অভিমন্যুই মৎস্যরাজের জামাতা হওয়ার
উপযুক্ত।মহারাজ বিরাট তাতে সম্মত হন। এরপর উপপ্লব্য নগরীতে অভিমন্যু ও
উত্তরার বিবাহ সম্পন্ন হয়।আর সেই অভিমুন্য ও উত্তরার পুত্র হলেন
পরীক্ষীত।যিনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় উত্তরার গর্ভে ছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুন কতৃক ভীষ্মের শরশয্যার পর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কৌরব সেনাপতি হন দ্রোণাচার্য।দ্রোণের
অধিনে যুদ্ধ চলাকলে যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিনে কৌরব সেনাপতি দ্রোণাচার্য একটি
চক্রব্যূহ রচনা করেন এবং পান্ডবদের তা ভেদ করতে আমন্ত্রণ জানান। এইসময়ে
চক্রব্যূহ ভেদ করার জন্য পান্ডব শিবিরে অভিমন্যু ব্যতীত আর কেউ উপস্থিত না
থাকায় যুধিষ্ঠির তাঁর ওপর এই গুরুভার অর্পণ করেন। এরপর অভিমন্যু যুদ্ধে
অবতীর্ণ হন এবং চক্রব্যূহ ভেদ করে কৌরব সেনা মধ্যে একাই উপস্থিত হন বীর
বালক অভিমুন্য। তাঁর শরবর্ষণে মদ্ররাজ শল্য ও দুঃশাসন মূর্ছিত হন। কর্ণের
এক ভাই ও শল্যের ভ্রাতা নিহত হয় এবং শল্য রণভূমি থেকে পলায়ণ করেন।ভয়াবহ
যুদ্ধ চলতে থাকে তখন।কৌরব সেনা দ্বারা বেষ্টিত হয়ে একাই সবার সাথে পরম
বিক্রমে যুদ্ধ করেন বীর অভিমুন্য।এইসময়
যুধিষ্ঠির, ভীম, ধৃষ্টদ্যুম্ন, শিখন্ডী, সাত্যকী, বিরাট ও দ্রুপদ ব্যূহে
প্রবেশ করার চেষ্টা করলে ধৃতরাষ্ট্রের ভগ্নিপতি সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ শিবের
বরে তাদের পরাস্ত করেন ও ব্যূহের প্রবেশ পথ রুদ্ধ করে্ন। কুরুসৈন্য বেষ্টিত
অভিমন্যু একাকী যুদ্ধ করতে থাকেন। কৌরবসৈন্য ছত্রভঙ্গ হয় এবং যোদ্ধারা
পালাতে থাকে। শল্যপুত্র রুক্মরথ, দুর্যোধনের পুত্র লক্ষণ ও কোশলরাজ বৃহদবল
তাঁর বাণে হত হন। অভিমন্যুকে অপ্রতিরোধ্য দেখে কর্ণ দ্রোণের উপদেশে
তাঁকে পিছন থেকে আক্রমণ করে তাঁকে রথচ্যূত ও ধনুর্হীন করেন এবং দ্রোণ, কৃপ,
কর্ণ, অশ্বত্থামা, দুর্যোধন ও শকুনি নিষ্করুণ ভাবে তাঁর ওপর শরাঘাত করতে
থাকেন।সপ্ত মহারথীর সাথে রথহীন অভিমন্যু খড়গ, চক্র, গদা এমনকি রথের চাকা
দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এইসময় দুঃশাসনের পুত্র তাঁর
মাথায় গদাঘাত করে। ফলে কৌরবসেনা নিপীড়িত বালক অভিমন্যুর প্রাণশূন্য দেহ
ভূপাতিত হয়। মাত্র ষোলো বছর বয়সে এক ষড়যন্ত্রের আর অনৈতিক যুদ্ধে তিনি
মৃত্যুবরণ করেন। অভিমুন্যের একমাত্র পুত্র পরীক্ষিৎ তাঁর মৃত্যুর পর জন্মগ্রহণ করেন।যিনি যুধিষ্টিরের পর হস্তিনাপুরের রাজা হন।
অমর চিত্র কথা ৩২ এর পর ৩৪ পোস্ট করতে হোল ... কারন ৩৩ নং হর্ষ বাংলায় প্রকাশিত হয়েছিল কি না কোন তথ্য নেই ।
ভীষ্ম - এক শাপগ্রস্ত বসুদেবতা
হিন্দু পুরাণে সর্বমোট ৩৩ প্রকার দেবতার অস্তিত্ব বিদ্যমান। এরা হলো : দ্বাদশ আদিত্য, একাদশ রুদ্র, অষ্টবসু এবং অশ্বিনীকুমারদ্বয়। তবে শেষ দুইজনের নাম সব শাস্ত্রে নেই। শাস্ত্র ভেদে এই দু'জনকে পৃথক পৃথক দেবতাদের দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বাদবাকিরা নির্বিবাদে সব শাস্ত্রেই বিদ্যমান আছেন। আমাদের আলোচ্য চরিত্র ভীষ্ম একজন শাপগ্রস্ত বসুদেবতা ছিলেন। ভীষ্মের চরিত্র জানার আগে চলুন জেনে নিই অষ্টবসুদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় আর ভীষ্মের পিতা শান্তনুর কথা।
অষ্টবসুদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় ==================== আমাদের মহাভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভীষ্ম চরিত্রটি আলোচনা করতে গেলে এদের মাঝে অষ্টবসুদের কথা জানা প্রয়োজন। এই আটজন বসুদেবতা উপদেবতা হিসেবে বিবেচিত হয়। বসুরা হলেন প্রতিনিধিত্বকারী দেবতা। কোথাও তাদের ইন্দ্রের প্রতিনিধি বলা হলেও অনেক ক্ষেত্রে এদেরকে বিষ্ণুর প্রতিনিধিও বলা হয়েছে। তাদের জন্মের ইতিহাস সম্পর্কে দুই প্রধান ভারতীয় পুরাণ রামায়ণ ও মহাভারতে ভিন্নতা আছে। রামায়ণে এদেরকে ঋষি কশ্যপ ও অদিতির পুত্র বলা হলেও, মহাভারতের মতে এরা প্রজাপতি মনুর সন্তান। যেখানে প্রথম কাহিনীতে এরা সরাসরি দেবতাদের ভাই হন, সেখানে মহাভারতে এরা হলেন মানুষের ক্রোড়ে জন্মের দরুন উপদেবতা। এই অষ্টবসুদের নামের ক্ষেত্রেও মহাভারতের সাথে রামায়ণের অমিল রয়েছে। তবে এখানে শুধু মহাভারতে উল্লেখিত নামগুলো দেয়া হলো :
১।। অনল (অগ্নির প্রতিনিধিত্বকারী), ২।। অনিল (বায়ুর প্রতিনিধিত্বকারী), ৩।। সোম (চন্দ্রের প্রতিনিধিত্বকারী), ৪।। অহস (অন্তরীক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী), ৫।। ধর বা পৃথু (পৃথিবীর প্রতিনিধিত্বকারী), ৬।। ধ্রুব (নক্ষত্রসমূহের প্রতিনিধিত্বকারী), ৭।। প্রত্যুষ (ঊষালগ্নের প্রতিনিধিত্বকারী) এবং ৮।। প্রভাষ বা দ্যু (দ্যুলোকের বা আকাশের প্রতিনিধিত্বকারী)। এদেরকে আবার আটটি দিকেরও (মানে পূর্ব, পশ্চিম ইত্যাদি দিকের) দেবত্ব আরোপ করা হয়েছে। অষ্টবসুদের মধ্যে নেতাস্থানীয় ছিলেন শেষোক্ত বসু প্রভাষ, যাকে আবার দ্যু বসু নামেও ডাকা হতো।
বসুদের কামধেনু চুরি ও ঋষি বশিষ্ঠের অভিশাপ ===================================== একসময় অষ্টবসুরা তাদের স্ত্রীদের নিয়ে সুমেরু পর্বতে অবস্থিত ঋষি বশিষ্ঠের আশ্রমে ভ্রমণ করতে গিয়েছিলেন। ঋষি বশিষ্ঠের নন্দিনী নামক একটি কামধেনু ছিলো (কামধেনু মানে হলো জাদুকরী ক্ষমতাসম্পন্ন এক গাভী)। এটি মন্ত্রবলে যেকোনো কামনা পূরণ করতে পারতো বলে এর নাম কামধেনু। অনেকটা আলাদীনের চেরাগের দৈত্যের মতো! ঋষি বশিষ্ঠ এটার সাহায্যে অষ্টবসুদের সহজেই সমাদর করতে পেরেছিলেন।
কিন্তু প্রভাষ পত্নীর এটার উপর দারুণ লোভ হলো। রাত্রে প্রভাষকে তার পত্নী এই গাভীটি চুরি করতে রাজি করালেন। তখন আশ্রমের সকলে নিদ্রা গেলে প্রভাষ, বিশেষ করে তার ভাই পৃথুর সহায়ক ভূমিকায়, গাভীটি চুরি করে নিয়ে পালিয়ে যেতে লাগলেন। এমনি সময়ে তিনি ও তার ভাই এবং তাদের পত্নীসহ চোরাই মাল নিয়ে ঋষি বশিষ্ঠের কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে যান। ক্রুদ্ধ বশিষ্ঠ তখন তাদের অভিশাপ দিলেন, প্রত্যেককেই উপ-দেবত্ব খুইয়ে মর্ত্যলোকে বাস করতে হবে। পরে অষ্টবসুদের অনুরোধে ঋষি বশিষ্ঠ প্রভাষ ব্যতীত সকলের শাস্তি কমিয়ে দেন। তিনি তাদেরকে বলেন যে, প্রভাষ ব্যতীত সকলেই জন্মের কয়েক ঘণ্টা পরই স্বর্গে ফিরে যেতে পারবেন। তবে প্রভাষকে চৌর্য কর্মের মূল হোতা হিসেবে মর্ত্যে দীর্ঘ জীবন থাকতে হবে। চিন্তিত বসুরা তখন উদ্ধারের জন্য দেবী গঙ্গার তপস্যায় মগ্ন হলেন।
ভীষ্মের পিতার কথা ================ একদা রাজর্ষি (যিনি রাজা হয়েও ঋষি) মহাভিষ নামে এক রাজা স্বর্গলাভ করেছিলেন। একবার স্বর্গ সভায় তিনি উপস্থিত ছিলেন। সেখানে বহু দেব-দেবীদের মাঝে গঙ্গাও ছিলেন। প্রবল বায়ুপ্রবাহে গঙ্গার সূক্ষ্ম বসন তখন খুলে যায়। এতে তিনি নিরাভরণা হয়ে গেলে সকলে দৃষ্টি সংযত করলেও রাজা মহাভিষ অসংকোচ দৃষ্টিতে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে রইলেন। গঙ্গাও সেসময় তার প্রতি কিছুটা আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তবে এই বিষয়টা ব্রহ্মার ভালো লাগেনি। তাই তিনি মহাভিষকে স্বর্গচ্যুতির অভিশাপ দিলেন। রাজার কাতর অনুনয়ের পর ব্রহ্মদেব তাকে মর্ত্যলোকে কিছুকাল বাস করে পরে পুনরায় স্বর্গে প্রবেশের অধিকার দিলেন। রাজা মহাভিষ তখন কুরুবংশীয় রাজা "প্রতীপ"-এর পুত্র হিসেবে জন্মের জন্য সংকল্প করলেন (‘শান্তনু’ নামে)। রাজা প্রতীপ নিজেও একজন রাজর্ষি ছিলেন। তিনি তার পত্নী'র সাথে গঙ্গার তীরে তপস্যা করতেন।
এদিকে দেবী গঙ্গা তপস্যারত বসুদের কাছে গেলে তারা তাকে গঙ্গা এবং প্রতীপ পুত্র শান্তনুর সন্তান হিসেবে প্রসব করে জলে বিসর্জিত করার জন্য অনুরোধ করেন। জবাবে গঙ্গা তাদের বলেন, তাই হবে, কিন্তু তাদের যেন একটি পুত্র জীবিত থাকে। নতুবা তার সাথে শান্তনুর সঙ্গম ব্যর্থ হবে বলে আশংকা প্রকাশ করেন।
বসুরা তখন সমাধান হিসেবে তাদের প্রত্যেকের নিজ বীর্যের অষ্টাংশ দেবার প্রতিশ্রুতি দিলেন। তারা এরপর গঙ্গাকে বললেন, এতে করে সেই জন্মানো পুত্র (ভীষ্ম) বলবান হবে, তবে তার সন্তান হবে না। গঙ্গা এভাবে অষ্টবসুদের বীর্যে সন্তান ধারণ করেছিলেন বলে ভীষ্মের অপর নাম হল ‘গাঙ্গেয়’, মানে গঙ্গাপুত্র। গঙ্গা অষ্টবসুদের প্রার্থনায় সম্মতি দিয়ে মহাভিষের কথা ভাবতে ভাবতে মর্ত্যে গমন করেন। তিনি তার নদীর তীরে তপস্যারত রাজা প্রতীপের ডান উরুতে বসে রাজার কাছে সঙ্গম প্রার্থনা করলেন। কিন্তু ডান উরুতে বসায় গঙ্গাকে রাজা প্রতীপ তা পুত্র, কন্যা, পুত্রবধূর স্থান স্মরণ করিয়ে দিয়ে তার সঙ্গম কামনা প্রত্যাখ্যান করেন। রাজা প্রতীপ গঙ্গাকে তার পুত্রবধূ হতে অনুরোধ করলে গঙ্গা তাতেই সম্মত হয়ে অন্তর্হিত হন। পরে রাজা প্রতীপের পুত্র হিসেবে রাজর্ষি মহাভিষ ‘শান্তনু’ পরিচয়ে জন্ম নেন। যৌবন লাভ করার পর প্রতীপ তাকে সিংহাসনে অভিষেক করিয়ে বললেন, "তুমি গঙ্গা তীরে যেয়ো। সেখানে এক রূপবতী কন্যা পাবে। তাকে তুমি বিবাহ করো, তবে তার পরিচয় জানতে চেয়ো না এবং তার কার্যে বাধা দিও না"। এই বলে তিনি তপস্যা করতে সপত্নীক বনে চলে যান।
শান্তনু ও গঙ্গার বিবাহ এবং ভীষ্মের জন্ম ============================= শান্তনু পিতার কথামতো গঙ্গাতীরে যান। সেখানে রূপসী দেবী গঙ্গাকে সাধারণ মানবী মনে করে তাকে প্রণয় নিবেদন করলে গঙ্গা শর্ত সাপেক্ষে রাজি হলেন। যদি রাজা তার পরিচয় জানতে না চান এবং তার কার্যে বাধা না দেন, তবে তিনি তাকে বিবাহ করবেন। তবে বাধা পেলে তাকে ত্যাগ করবেন। পিতার কথা স্মরণ করে শান্তনু রাজি হন।
কিছুকাল পরে যথাক্রমে তাদের আটটি সন্তান হলো। এদের সাতজনকেই গঙ্গাদেবী জলে নিক্ষেপ করেন। শান্তনু মনে মনে ক্রুদ্ধ হলেও গঙ্গার তাকে পরিত্যাগের কথা ভেবে নীরব থাকলেন। তবে অষ্টম পুত্রের ক্ষেত্রে আর না পেরে বাদ সাধলেন। গঙ্গাও তখন বললেন, “ঠিক আছে রাজা, আমি একে জলে নিক্ষেপ করবো না। তবে তোমার সাথে আমার থাকাও শেষ হলো”। এরপর পূর্বের স্বরূপে ফিরে শান্তনুকে অষ্টবসুর কাহিনী বললেন। তারপর সদ্যজাত শিশুটিকে নিয়ে অন্তর্হিত হলেন। শান্তনু তখন বিষণ্ণ মনে রাজপ্রাসাদে ফিরে যান।
দেবব্রতের ভীষ্ম হয়ে ওঠার কাহিনী ============================ মহারাজ শান্তনু ও গঙ্গার পুত্র ‘দেবব্রত’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ঋষি বশিষ্ঠের কাছে শাস্ত্র শিক্ষা এবং পরশুরামের (বিষ্ণুর এক অবতার) কাছে অস্ত্র শিক্ষা অধ্যয়ন করলেন। পরে যুবক বয়সে উত্তীর্ণ হলে গঙ্গা তাকে তার পিতা শান্তনুর নিকট ফিরিয়ে দেন। রাজা তাকে যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করেন।
একসময় শান্তনু ‘সত্যবতী’ নামের এক ধীবররাজার কন্যার প্রেমে পড়েন (উনারও একটা লম্বা ইতিহাস আছে! মহাভারতের রচয়িতা নামে খ্যাত মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস এরই ঔরসজাত সন্তান, পরাশর মুনির সাথে কুমারী অবস্থায় নদীতে নৌকা মাঝে মিলিত হয়ে এই সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন)। সত্যবতীকে বিয়ে করতে চাইলে সত্যবতীর পিতা রাজা শান্তনুর কাছে রাণী এবং শুধু তার কন্যার পুত্রদেরই রাজ্যাধিকার চান। শান্তনু তাতে সম্মত না হয়ে বিষণ্ণ মনে প্রাসাদে ফেরত আসেন। নিজের পিতাকে বিষণ্ণ দেখে এবং অমাত্যদের কাছে এর কারণ শুনে তিনি ধীবররাজের কাছে ছুটে গিয়ে ধীবরকন্যা সত্যবতীকে তার পিতার জন্য চাইলেন। নিজে প্রতিজ্ঞা করলেন যে, তিনি রাজ্যভোগ ও বিবাহ করবেন না এবং নিঃসন্তান থাকবেন। এছাড়াও নিঃস্বার্থ এবং নিরাসক্ত হয়ে কুরুরাজ্যের আমৃত্যু সেবা করবেন। তার এরূপ দৃঢ় সংকল্পের কারণে তার পিতা শান্তনু খুশি হলেন এবং তাকে ভীষ্ম নাম ও ইচ্ছামৃত্যুর বর দিলেন। সেই থেকেই দেবব্রতের নাম পাল্টে গিয়ে তিনি ভীষ্ম নামে পরিচিত হলেন। ভীষ্ম নিজেকে কুরুবংশের অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
কাশীরাজের তিন কন্যা অপহরণ ========================= বিয়ের পর শান্তনু ও সত্যবতী দম্পতির দুই পুত্র হলো, চিত্রাঙ্গদ এবং বিচিত্রবীর্য। এদের যৌবন লাভের পূর্বেই শান্তনুর মৃত্যু হয়। চিত্রাঙ্গদ যুবক বয়সে চিত্রাঙ্গদ নামেরই এক গন্ধর্বের সাথে যুদ্ধে নিহত হলে অপ্রাপ্তবয়স্ক বিচিত্রবীর্যকে ক্ষমতায় বসানো হয়। বিচিত্রবীর্য বড় হলে তার বিয়ের পাত্রীর জন্যে ভীষ্ম কাশীরাজের কন্যাদের স্বয়ংবর সভায় যান। কিছুটা বৃদ্ধ ভীষ্মকে দেখে উপস্থিত অন্য রাজা আর সভাসদরা উপহাস করলে ক্রোধান্বিত ভীষ্ম তাদের সামনে কাশীরাজের তিন কন্যা অম্বা, অম্বিকা এবং অম্বালিকাকে বলপূর্বক অপহরণ করেন। এই সময়ে অম্বার প্রেমিক শাল্বরাজ বাধা দিতে গেলে ভীষ্ম তাকে হত্যা করেন (মতান্তরে তাকে আহত করে ছেড়ে দেন)। পরে অম্বা তার প্রেমের কথা ভীষ্মকে জানালে তাকে সসম্মানে যেতে দেন।
অনেকে মনে করেন, এই সময়ে ভীষ্ম ও অম্বা পরস্পরকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। ভীষ্ম আর অম্বার এই কল্পিত প্রেম কাহিনী নিয়ে আলাদা বহু ভারতীয় সাহিত্য রচিত হয়েছে। তবে মূল মহাভারতে অম্বার প্রেমিক শাল্বরাজ অম্বাকে পরপুরুষ ছুঁয়েছে অভিযোগে পরিত্যাগ করে। আবার আরেক সংস্করণে প্রেমিককে অযথা হত্যার জন্য ভীষ্মের উপর অম্বা তীব্র রকমের ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন, যেটি পরে দ্বন্দ্বে গিয়ে গড়ায়। বাকি দু'জন, অম্বিকা ও অম্বালিকার সাথে ভীষ্ম রাজা বিচিত্রবীর্যের বিয়ে দেন। বিচিত্রবীর্য দুই সুন্দরী পত্নী পেয়েই কামাসক্ত হয়ে পড়েন। এর সাত বছর পর কোনো উত্তরাধিকারী না রেখেই যক্ষ্মারোগে বিচিত্রবীর্য মারা যান।
অম্বা ও ভীষ্মের দ্বন্দ্ব ================= এদিকে সর্বদিকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে অম্বা ভীষ্মকে তাকে বিবাহ করতে বললে ভীষ্ম তা করতে অস্বীকৃতি জানান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে অম্বা ভগবান পরশুরামকে ভীষ্মের বিরুদ্ধে যথাবিহিত করার আহ্বান করলে পরশুরাম তাকে নিয়ে ভীষ্মের কাছে উপস্থিত হয়ে দু'টি বিহিত করার আদেশ দিলেন: ১. অম্বাকে বিবাহ, কিংবা ২. যুদ্ধের আহ্বান। ভীষ্ম তার চিরকুমার থাকার প্রতিজ্ঞার জন্য বিবাহের প্রতিশ্রুতি দিলেন না। সেজন্য গুরু-শিষ্য বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। দীর্ঘদিনের যুদ্ধে কেউই কাউকে হারাতে পারলেন না। পরে দেবতারা উপস্থিত হয়ে তাদের যুদ্ধে নিরস্ত করলেন।
তখন অম্বা দেবতাদের কাছে পরজন্মে ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ হতে চেয়ে বর চাইলে দেবতারা তা পূরণ করেন। অম্বা তখনি নিজেই নিজের চিতা সাজিয়ে তাতে দেহত্যাগ করেন। অম্বা পরবর্তীতে পাঞ্চালরাজা দ্রুপদের প্রথম কন্যা সন্তান হিসেবে জন্ম নেন। দ্রুপদ প্রথমে তার নারী পরিচয় গোপন রাখতে নাম রাখেন শিখণ্ডী। ঘটনাক্রমে তার সাথে দর্শানরাজ হিরণ্যবর্মার কন্যার সাথে বিয়ে হয় এবং সেই কন্যার কাছ থেকে শিখণ্ডীর আসল রূপ সর্বত্র প্রকাশ পেয়ে যায়। লোকে শিখণ্ডীকে “শিখণ্ডিনী” নামে ডাকতে আরম্ভ করে। এসব কথা দর্শানরাজের কানে গেলে তিনি ক্ষিপ্ত হন। ক্রুদ্ধ হিরন্যবর্মা পাঞ্চালের রাজা দ্রুপদকে যুদ্ধের আহ্বান করেন।
দ্রুপদের বিপত্তিতে কষ্ট পেয়ে তাদের পুত্র রূপী কন্যা শিখণ্ডিনী গভীর বনে আত্মহননের উদ্দেশ্যে চলে যান। সেখানে স্বর্গের কোষাধ্যক্ষ কুবের দেবতার সঙ্গী এক যক্ষের সাথে শিখণ্ডিনীর সাক্ষাৎ হয়। সেই যক্ষই তার পুরুষত্ব শিখণ্ডিনীর সাথে অদলবদল করে শিখণ্ডিনীকে পুরুষ বানিয়ে দেয়। এসব তথ্য ভীষ্ম গুপ্তচর মারফৎ বিভিন্ন সময়ে জানতে পারেন এবং মনে মনে শিখণ্ডীকে বধের সংকল্প ত্যাগ করেন। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, ভীষ্ম রূপান্তরকামী, নারী ও দুর্বলের ওপর প্রহার না করার এবং তাদের সামনে অস্ত্র পরিত্যাগ করার শপথ করেছিলেন। এভাবেই দেবতাদের কথা সফল হয়েছিলো।
কুরুবংশ রক্ষা ============== বিচিত্রবীর্য ও চিত্রাঙ্গদের কোন উত্তরাধিকারী না রেখে যাওয়ায় কুরুবংশ সংকটে পড়ে। এদিকে ভীষ্মের প্রতিজ্ঞার দরুন তিনিও সন্তান উৎপাদন করতে পারবেন না। এই সময়ে তিনি তার সৎ মাতা সত্যবতীর সাথে শলা-পরামর্শপূর্বক তার পুত্র কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস মুনিকে বিচিত্রবীর্যের দুই স্ত্রীর গর্ভে সন্তান উৎপাদনের জন্য ডেকে আনেন। তিনি ধীবরকন্যার সন্তান হওয়ায় তার শরীরে মাছের মতো গন্ধ ছিলো। আর সন্ন্যাসীর সাজপোশাকে থাকতেন বিধায় বিচিত্রবীর্যের দুই রাণী তাকে পছন্দ করলেন না। তবে ভীষ্ম আর সত্যবতীর জোরাজুরিতে তারা উভয়েই একবার একবার করে বেদব্যাসের সাথে মিলিত হন।
অম্বিকা অপছন্দের মিলনের সময়ে ঘৃণাবশত চোখ মুদে ছিলেন, তাই বেদব্যাস তাকে অন্ধ পুত্র জন্ম দেয়ার অভিশাপ দেন। আর অম্বালিকা বেদব্যাসের সন্ন্যাসীর সাজ দেখে ভয়ে পাংশুটে চেহারা হয়ে গিয়েছিলেন। তাই বেদব্যাসের অভিশাপে তার পাণ্ডুবর্ণ পুত্র জন্ম হবে বলে জানলেন। এভাবেই বেদব্যাসের ঔরসে এক রাণীর গর্ভে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র, অপর রাণীর গর্ভে পাণ্ডুর জন্ম হয়। অন্ধ পুত্র জন্মের কারণে অম্বিকার শাশুড়ি সত্যবতী রজঃস্বলা হলে পুনর্বার তাকে বেদব্যাসের কাছে যেতে বলেন। তখন রাণী তার এক শূদ্র দাসীকে তার কাছে পাঠিয়ে দেন। সেই দাসীর গর্ভে মহামতি বিদুরের জন্ম হয়। এমনভাবেই ভীষ্ম কুরুবংশকে এক অনিবার্য পতনের হাত থেকে উদ্ধার করেন।
ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু ও বিদুরের অভিভাবক এবং তাদের বিয়ের ঘটকালি ============================================= ভীষ্ম পিতৃহীন, অভিভাবকহীন সন্তানদের পিতৃসম অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার জন্যই ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু, বিদুর সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছিলেন। বিদুর এদের মাঝে সবচেয়ে বেশি ধর্মবেত্তা, পাণ্ডু অতুলনীয় ধনুর্ধর, আর ধৃতরাষ্ট্র সর্বাপেক্ষা অধিক বলশালী ছিলেন। প্রত্যেকেই প্রাপ্তবয়স্ক হলে ভীষ্ম পাণ্ডুকে রাজা নির্বাচিত করেন। বাকি দুইজনকে না করার কারণ ছিলো, ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ আর বিদুর শূদ্রা গর্ভজাত। এতে ধৃতরাষ্ট্র মনে মনে পাণ্ডুর সৌভাগ্যের জন্য কিছুটা নাখোশ হয়েছিলেন। বিদুর অবশ্য মহামন্ত্রীর পদ নিয়েই তুষ্ট থাকেন।
ভীষ্ম পাণ্ডুকে যাদব বংশের কুন্তি ভোজের পালিতা কন্যা কুন্তি এবং মদ্রদেশের রাজা শল্যের ভগিনী মাদ্রীর সাথে বিয়ে দেন। আর ধৃতরাষ্ট্রকে গান্ধার রাজ্যের রাজা সুবলের সাথে ভাতৃত্ব গড়তে তার কন্যা গান্ধারীর সাথে বিয়ে দেন। বিয়ের পর গান্ধারী তার স্বামী দৃষ্টিহীন হওয়ায় চোখে এক টুকরো কাপড় বেঁধে রেখে নিজেও দৃষ্টিহীন থাকার সিদ্ধান্ত নেন।
ভীষ্মের সাথে কর্ণ, পঞ্চপাণ্ডব এবং ধৃতরাষ্ট্রদের সম্পর্ক ====================================== কুন্তির বড় সন্তান কর্ণের জন্ম রহস্যের ব্যাপারে ভীষ্ম জ্ঞাত ছিলেন। কর্ণ দুর্যোধনের মতো অধার্মিকদের সাথে জোটবদ্ধ হলে ভীষ্ম রুষ্ট হন। এজন্য তিনি প্রায়ই কর্ণকে নানাভাবে কটাক্ষ করে অপমানকর মন্তব্য করতেন। কর্ণের অহংকারী আচরণেরও তীব্র সমালোচনা করতে ছাড়তেন না। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কর্ণকে অপমানিত করে তিনি নিজে নিহত না হওয়া পর্যন্ত কর্ণের প্রবেশ বন্ধ রেখেছিলেন। পরে একাদশ তম দিনে কর্ণ যুদ্ধ করতে নামেন। পিতৃহীন পঞ্চপাণ্ডবরাই ভীষ্মের বিশেষ প্রিয় ছিলো। তন্মধ্যে অর্জুনের প্রতি তিনি বিশেষ পক্ষপাত করতেন। দুর্বুদ্ধি সম্পন্ন ধৃতরাষ্ট্র-পুত্রদের হাত থেকে তাদের রক্ষার জন্য তিনি বিশেষ সচেষ্ট ছিলেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময়ও। তিনি ধৃতরাষ্ট্র-পুত্রদের শাসন করে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইতেন।
ভীষ্মের উদ্যোগে কৌরব ও পাণ্ডবদের বিখ্যাত অস্ত্র গুরু দ্রোণের কাছে পাঠানো হয়। তাদের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারটাও যথাযথ ভাবে প্রতিপালন করেন। ভীষ্মের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিলো, দুর্যোধন কর্তৃক আয়োজিত অক্ষক্রীড়ায় বাজি জিতে কৌরব পক্ষ দ্বারা পাণ্ডবদের ও তাদের মহিষী দ্রৌপদির অপমান ও রাজ্যহারা করা ঠেকাতে তার অক্ষমতা প্রকাশ করা। যদিও তিনি দুর্যোধনের মতিগতির ব্যাপারে পাণ্ডবদের সতর্ক করেছিলেন, তবুও অক্ষক্রীড়া প্রিয় যুধিষ্ঠির তা কানে তোলেননি। এই ঘটনাই বিখ্যাত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়।
ভীষ্মের যুদ্ধসমূহ ============= মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ ব্যতীত ভীষ্ম তার জীবনে অনেক যুদ্ধ করে কুরু সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। মহাবীর কর্ণকে দুর্যোধন যে অঙ্গ দেশ দেন, তা ভীষ্মেরই জয় করা অঞ্চল। এছাড়া এক বছর অজ্ঞাত বাসকালে পাণ্ডবরা যে বিরাটনগর রাজ্যে ছদ্মবেশে আশ্রিত ছিলেন; সে দেশ দখলে দ্রোণ, কর্ণ, অশ্বত্থামা, দুর্যোধন, সুশর্মা প্রমুখ বীর যোদ্ধাদের নিয়ে তিনি যুদ্ধ করেন। কিন্তু একা বৃহন্নলা রূপী অর্জুনের নিকটে তারা সকলেই পরাস্ত হন। তবে যাই হোক, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরব পক্ষকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্যই ভীষ্ম অধিক স্মরণীয়। ভীষ্ম সর্বমোট দশদিন কুরুক্ষেত্রে কৌরব পক্ষকে বীরত্বের সাথে পরিচালনা করেছিলেন। তবে পাণ্ডবদের বিপক্ষে তিনি স্নেহ বশত দুর্বল ছিলেন। এই দশদিনের বিশাল যুদ্ধের প্রথম নয় দিনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নরূপঃ
১ম দিন-- ভীষ্মের নেতৃত্বে কৌরব পক্ষ সর্বতোমুখ ভয়ংকর ব্যূহ নামে একটি ব্যূহ রচনা করে পাণ্ডবদের আক্রমণ করে। জবাবে পাণ্ডবদের শ্যালক ও সর্বাধিনায়ক ‘ধৃষ্টদ্যুম্ন’ বজ্র ও অচল নামক দু'টো ব্যূহ রচনা করে তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন। এইসময় অর্জুন ও তার পুত্র অভিমন্যুর সাথে ভীষ্ম ঘোর যুদ্ধে লিপ্ত হন। এদিন ভীষ্ম পাণ্ডবদের এক সেনাপতি বিরাটরাজের ছেলে শ্বেতকে হত্যা করেন। ভীষ্মের বীরত্বে এদিন কৌরব পক্ষ বিজয়ী হয়।
২য় দিন-- দ্বিতীয় দিনে পাণ্ডবরা ক্রৌঞ্চারুণ নামক ব্যূহ রচনা করে। এদিনও ভীষ্মের সাথে অর্জুনের তীব্র যুদ্ধ হয়। এরপর ভীমকে ব্যাপক কৌরব সৈন্য বধ করতে দেখে তাকে বাধা দিতে এগিয়ে আসেন। ভীমের রথ ধ্বংস করে তাকে ভূপাতিত করেন। ভীমও এসময় ভীষ্মের সারথিকে বধ করলে ভীষ্ম দ্রুত বেগে নিজেই রথ চালিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করেন। এদিন অর্জুনের বীরোচিত ভূমিকায় পাণ্ডবদের জয় হয়।
৩য় দিন-- এদিন ভীষ্ম গড়ুর ব্যূহ এবং পাণ্ডবরা অর্ধচন্দ্র ব্যূহ রচনা করেন। প্রথমে উভয়পক্ষই সমান তালে লড়াই করলেও কিছুক্ষণ পর যুদ্ধের ফলাফল পাণ্ডব পক্ষে যেতে শুরু করে। তখন ভীষ্ম আগ্রাসী ভাবে সৈন্যদল নিয়ে পাণ্ডবদের আক্রমণ করেন। এতে পাণ্ডবরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে পালাতে শুরু করে। ভীষ্মের শরাঘাতে বহু সৈন্য হতাহত হওয়ার বিপরীতে অর্জুনকে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকতে দেখে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের মাস্টারমাইণ্ড শ্রীকৃষ্ণ প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে চক্র হস্তে ভীষ্ম বধে উদ্যত হন। পরে অর্জুনের কথায় নিরস্ত হন। এরপর অর্জুন মাহেন্দ্র অস্ত্র প্রয়োগ করে কৌরব সৈন্য বিধ্বস্ত করে বিজয় ছিনিয়ে নেন।
৪র্থ দিন-- এদিন উভয়পক্ষেই অনেক বীর হতাহত হয়। ভীম দুর্যোধনের ১৪ ভ্রাতা হত্যা করেন। ভীমের রাক্ষস পুত্র ঘটোৎকচের সহায়তায় পাণ্ডবদের জয়লাভ হয়।
৫ম ও ৬ষ্ঠ দিন-- এই দুই দিন ভীষ্ম মকর ও ক্রৌঞ্চ ব্যূহের বিপরীতে পাণ্ডব পক্ষ শ্যেন ও মকর ব্যূহ নির্মাণ করে সৈন্য পরিচালনা করে। পঞ্চম দিনে অর্জুন পঁচিশ হাজার মহারথ (কয়েক রথের সমন্বয় গঠিত বাহিনীর নায়ক) বধ করেন। ষষ্ঠ দিনে ভীষ্ম ও দ্রোণের সাথে ভীম এবং অর্জুনের ব্যাপক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ভীম দুর্যোধনের চার ভাইকে হত্যা করেন।
৭ম ও ৮ম দিন-- সপ্তম ও অষ্টম দিনে ভীষ্ম মণ্ডল, কূর্ম ব্যূহ এবং পাণ্ডবরা বজ্র ও শৃঙ্গাটক ব্যূহ তৈরি করে যুদ্ধ করেছিল। সপ্তম দিনে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে ভীষ্মের যুদ্ধে পাণ্ডবদের অনেক বীর পরাজিত হয়। এদিন শিখণ্ডী ভীষ্মের সাথে দ্বৈরথে নামেন। তবে পরাজিত হন। অষ্টম দিনে বিভিন্ন বীরযোদ্ধারা পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহত হন। ঘটোৎকচের মায়াবী যুদ্ধে ও অর্জুনের বীরত্বে কৌরব পক্ষ পরাজিত হয়। ভীম দুর্যোধনের সাত ভ্রাতার প্রাণ হরন করেন।
৯ম দিন-- ভীষ্মের এদিন অমানুষিক বিক্রমে পাণ্ডবদের হতশ্রী দশা শুরু হয়। অর্জুনের ক্লীবত্ব দেখে এদিন শ্রীকৃষ্ণ ফের প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করে রথের চাকা তুলে ভীষ্মকে বধে এগিয়ে যান। এসময় ভীষ্ম ও অর্জুনের অনুরোধে কৃষ্ণ তার সংকল্প ত্যাগ করেন। সেদিনকার মতো যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
ভীষ্মের পতন ============ দশম দিনের যুদ্ধের পূর্ব রাত্রে শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শ অনুযায়ী পাণ্ডবরা লুকিয়ে ভীষ্মের শিবিরে গিয়ে তাকে বধের উপায় জানতে চান। ভীষ্ম তখন তার প্রতিজ্ঞা এবং শিখণ্ডীর সামনে অস্ত্র ত্যাগের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে দেন। সেই অনুযায়ী পাণ্ডবরা শিখণ্ডীকে অগ্রগামী করে তার পেছনে পেছনে গিয়ে ভীষ্মের সামনে দশম দিনে রণভূমিতে উপস্থিত হন। ভীষ্ম অস্ত্রত্যাগ করলে পাণ্ডবরা তাকে তীব্র শরবর্ষণ করে রথ থেকে ভূপাতিত করেন। বাণবর্ষণে আহত ভীষ্ম তখন ভূমিতে সেই তীরের উপরই শয্যাশায়ী হন! এটিই বিখ্যাত ‘শরশয্যা’ নামে পরিচিত। তবে তাতে তিনি ইচ্ছামৃত্যুর বরে মারা গেলেন না।
যুধিষ্ঠিরকে ভীষ্মের উপদেশমূলক গল্পসমূহ =============================== যুদ্ধে জয়ের পর ভীষ্মের কাছে বিজয়ী সম্রাট যুধিষ্ঠির সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য উপদেশ চাইতে গিয়েছিল। ভীষ্ম এসময় বিভিন্ন উপকথার (fables) মাধ্যমে রাষ্ট্র, কূটনীতি, রাজনীতি বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেছিলেন। এসব রূপকথা মহাভারতকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছে।
ভীষ্ম-কর্ণ সংবাদ ============== যুধিষ্ঠির, পাণ্ডব পক্ষ ও অমাত্যবর্গ ভীষ্মের শরশয্যার স্থান হতে সরে গেলে সেখানে ভীষ্মের সামনে কর্ণ এসে উপস্থিত হন তাকে অভিবাদন ও যুদ্ধ জয় করার আশীর্বাদ নিতে। ভীষ্ম কর্ণের মঙ্গল কামনা করলেও যুদ্ধ জয় করার আশীর্বাদ দিতে অসম্মত হন। এছাড়া এই সময় কর্ণকে তার আসল মাতার (কুন্তি) কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত থেকে বিরত থাকতে বলেন। জবাবে কর্ণ তার দুর্যোধনের কাছে করা প্রতিজ্ঞা এবং অর্জুনের সাথে দীর্ঘদিনের লালিত দ্বৈরথের কথা ভেবে তা অগ্রাহ্য করেন। ভীষ্ম তখন তাকে ভগবান পরশুরামের দেওয়া অভিশাপের ব্যাপারে মনে করিয়ে দিয়ে সাবধান করেন। তবে এসব ন্যূনতম প্রভাবই ফেলে কর্ণের সিদ্ধান্তে। কথায় আছে না, কাঙালের কথা বাসি হলেই মিষ্টি হয়! তেমনি ভীষ্মের পূর্বানুমান সঠিক প্রমাণিত হয়েছিলো। কর্ণ অর্জুনের হাতে নিহত হয়েছিলেন।
ভীষ্মের মৃত্যু =========== ভীষ্ম একটানা আটান্ন দিন (মতান্তরে, কোথাও ছাপ্পান্ন বা সাতান্ন দিন) রণভূমিতে শরশয্যায় ছিলেন। ভীষ্ম উত্তরায়ণ তিথি নামক এক পবিত্র তিথিতে মৃত্যুবরণের সংকল্প করেছিলেন। দক্ষিণায়ন তিথি শেষ হয়ে উত্তরায়ণ তিথি এলে সেই শুভক্ষণে দীর্ঘজীবী ভীষ্ম অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
ভীষ্মের কাহিনী মহাভারতের এতো ব্যাপকভাবে জড়িয়ে আছে যে তাকে ছাড়া এই মহাকাব্যের পাঠ অসম্পূর্ণ। তিনি প্রায় প্রত্যেক চরিত্রের যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেছেন। দুর্যোধনের কথায় আহত হয়ে পাণ্ডবদের উপর প্রহার করলেও আদরবশতঃ অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেননি। পিতার সুখের জন্যে নিজের সুখ ত্যাগ করা, কুরুবংশের অভিভাবক স্বরূপ দায়িত্ব পালন, সুন্দরী অম্বার সাথে তার বৈচিত্র্যময় সম্পর্ক ও দ্বন্দ্ব ইত্যাদি কাহিনী মিলিয়ে এই চরিত্রের দীর্ঘদিনের জীবনের এতো ভরপুর তথ্য আছে যে তা দিয়ে আরেকটা মহাকাব্য রচনা সম্ভব।
(সমাপ্ত)
খুব তাড়াতাড়ি আসতে চলেছে বেতালের এই সিরিজ... রিগাল পাব্লিকেশন কি বলছে দেখা যাক ...
We have immense pleasure to announce the advent of PHANTOM in India now. THE GHOST will be WALKING through every nook and cranny of India stealthily with the unstinting support of readers from all walks of life.
The first two comic books (No. 1 & No. 2) contain a total number of 4 stories. The price for each comic book (with 2 stories in it) is only Rs. 120/-. As an INAUGURAL OFFER we make both comics available for only Rs. 250/- including delivery charges for sending anywhere in India (Offer valid for bookings till September 10, 2020). For your copies, kindly contact us through our Whatsapp number 9481052592.
We warmly welcome all of you to the PHANTOM WORLD.
২৮ এর পর ৩২ পোস্ট করতে হোল... ২৯ ''হর- পার্বতী'' এখন পর্যন্ত পুরানো প্রিন্ট নেই আর ''বাসবদত্তা'' ও ''সুদামা'' বাংলায় প্রকাশিত হয়েছে কি না কোন তথ্য নেই ...।
২ জানুয়ারি, গুরু গোবিন্দ সিংহ জয়ন্তী। এটি শিখ সম্প্রদায়ের অন্যতম
গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান। গুরু গোবিন্দ সিংহ জী ছিলেন শিখধর্মের দশম গুরু,
তাঁর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এই দিনটি উদযাপিত হয়। বর্তমান ভারতের বিহার
রাজ্যের পাটনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শিখ সম্প্রদায়ের মানুষরা এই দিনে
তাদের পবিত্র জায়গা, গুরুদ্বার যান এবং প্রার্থনা করেন। সেখানে বিশাল
সমাবেশ হয় এবং ভক্তিমূলক গান হয়।
গুরু
গোবিন্দ সিংহ -এর জীবন এবং শিক্ষাগুলি শিখ সম্প্রদায়ের প্রত্যেক মানুষের
কাছে অনুপ্রেরণা। তিনি সামাজিক সাম্যকে সমর্থন করেছিলেন এবং অত্যাচারের
বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, গুরু গোবিন্দ
সিংহ জয়ন্তী প্রতি বছর ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে পড়ে। তবে, উৎসব উদযাপন হয়
নানকশাহী বর্ষপঞ্জি অনুসারে। এইবছর অর্থাৎ, ২০২০ সালে ২ জানুয়ারি এই দিবস
পালিত হচ্ছে।
আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে এখানে গুরু গোবিন্দ সিংহ সম্পর্কে কিছু তথ্য দেওয়া হল -
১)
১৬৬৬ সালে গুরু গোবিন্দ সিংহ বিহারের পাটনায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তখন
তাঁর নাম ছিল গোবিন্দ রাই। তাঁর পিতা ছিলেন গুরু তেগ বাহাদুর ও মা ছিলেন
মাতা গুজরি।
২) মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের আদেশে গুরু গোবিন্দ সিংহ- এর
পিতা অর্থাৎ শিখদের নবম গুরু, গুরু তেগ বাহাদুরের শিরচ্ছেদ-এর পর মাত্র নয়
বছর বয়সে গুরু গোবিন্দ সিংহ-কে শিখ সম্প্রদায়ের দশম গুরু করা হয়।
৩) শৈশবকালে, গুরু গোবিন্দ সিংহ বেশ কয়েকটি ভাষা শিখেছিলেন, যেমন - সংস্কৃত, গুরুমুখী, হিন্দি, ব্রজ, উর্দু, ফারসি, ইত্যাদি।
৪) একজন ভাল ও শক্তিশালী যোদ্ধা হওয়ার জন্য তিনি মার্শাল আর্ট শিখেছিলেন।
৫) পরে, তিনি তাঁর বাসস্থান পাঞ্জাবের আনন্দপুর সাহিব ছেড়ে সিরমুরের রাজা মাত প্রকাশের আমন্ত্রণে হিমাচল প্রদেশের নাহান-এ চলে যান।
৬) পাওন্তা সাহিব নামক একটি গুরুদ্বার, গুরু গোবিন্দ সিং প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
৭)
১৬৮৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে গুরু গোবিন্দ সিংহ শিবলিক
পাহাড়ে ভীম চাঁদ, গারওয়ালের রাজা ফতেহ খান এবং অনেক স্থানীয় রাজাদের
বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। যুদ্ধটি কেবল একদিন স্থায়ী হয়েছিল এবং গুরু
গোবিন্দ সিং বিজয়ী হয়েছিলেন।
৮) ১৬৯৯ সালে তিনি খালসা সম্প্রদায়
প্রতিষ্ঠা করেন। এরপরেই তিনি তাঁর সমস্ত অনুসারীদের নাম দিয়েছিলেন 'সিংহ'।
খালসার প্রথম পাঁচ সদস্যকে তিনি নাম দেন পাঁচ প্যায়ারে।
বিখ্যাত
পঞ্চ 'ক'বা শিখদের নীতি ওই একই দিনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই পাঁচটি 'ক' হল -
কেশ (চুল), কাঙ্গা (কাঠের চিরুনি), কারা (লোহার বালা), কাচ্চা (হাঁটুর
দৈর্ঘ্যের দড়ি বাঁধা বস্ত্র) এবং কৃপাণ (তরোয়াল)। খালসা সম্প্রদায় মূলত
শিখ সম্প্রদায় তবে, এর মূল লক্ষ্য ছিল সমাজের নিরীহ ও দুর্বল অংশকে
অত্যাচার থেকে রক্ষা করা।
৯) তিনি গুরু গ্রন্থ সাহেব প্রবর্তন করেন। এর মধ্যে গুরু গোবিন্দ সিংহের সমস্ত শিক্ষা রয়েছে।
১০)
ঔরঙ্গজেব কর্তৃক নিয়মিত দ্বন্দ্ব ও নির্যাতনের পরে, গুরু তাঁকে ফারসি
ভাষায় একটি চিঠি লিখেছিলেন যেখানে, শিখ সম্প্রদায়ের উপর মুঘলদের হিংস্র,
অমানবিক ও অপকর্মের কথা তুলে ধরা হয়েছিল। সেই চিঠিটি এখন জাফরনামা বা
বিজয়ের চিঠি নামে খ্যাত।
১১) ঔরঙ্গজেব মারা যাওয়ার পরে এবং
বাহাদুর শাহ সিংহাসনে আরোহণের পরে, শিখ সম্প্রদায়ের সাথে শাহ
বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করেন এবং গুরুকে 'হিন্দ কা পীর' উপাধি দেন। তবে, শাহ-কে
নবাব ওয়াজির খান প্ররোচিত করেছিলেন গুরু গোবিন্দ সিংহ-কে হত্যা করতে।
১২)
ফলস্বরূপ, ১৭০৭ সালে, দুই আক্রমণকারী জামশেদ খান এবং ওয়াসিল বেগ-কে
প্রেরণ করা হয়েছিল ঘুমন্ত অবস্থায় গুরুকে হত্যা করার জন্য। তারা ঘুমন্ত
অবস্থায় গুরুকে ছুরিকাঘাত করে। তবে গুরু লড়াই করেন এবং আক্রমণকারীরা নিহত
হন।
১৩) ১৭০৮ সালের ৭ অক্টোবর গুরু গোবিন্দ সিংহ- এর মৃত্যু হয়।
১৪) গুরু গোবিন্দ সিংহ কেবল অবিচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন।
১৫) তিনি শিল্পকলা প্রেমিক ছিলেন এবং অনেকগুলি কবিতাও রচনা করেছিলেন।
১৬) তিনি গোটা খালসা ও শিখ সম্প্রদায়কে নিজের সন্তান হিসেবে বিবেচনা করতেন।
গুরু
গোবিন্দ সিংহ ছিলেন একজন যোদ্ধা, কবি, আধ্যাত্মিক শিক্ষক এবং দার্শনিক।
ধর্মীয় শাস্ত্রের মাধ্যমে, তিনি তাঁর জ্ঞানের মধ্যে দিয়ে তাঁর
সম্প্রদায়ের মানুষদের কাছে পৌঁছেছিলেন। তাঁকে স্মরণে রাখতে, প্রতি বছর শিখ
সম্প্রদায়ের মানুষরা তাঁর জন্মবার্ষিকী অত্যন্ত উদ্দীপনার সহিত উদযাপন
করে। এইদিন সবাই মানবজাতির কল্যাণ ও সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করে।
ইতিহাসেএকাধিক রাজাদের নামের ক্ষেত্রে দেখা যায় একই
রকম নাম আর নামের প্রথমে বাশেষে সংখ্যা যুক্ত, অনেকের মতে সেগুলো নাম নয়, সম্ভবত উপাধি। ঠিক যেমন -প্রথম
চন্দ্রগুপ্ত (চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য), দ্বিতীয়
চন্দ্রগুপ্ত (চন্দ্রগুপ্তবিক্রমাদিত্য), প্রাচীন এবং মধ্যযুগে এটা ভারতেই শুধু নয়
ইউরোপ এবং পশ্চিমএশিয়ার
বিভিন্ন সাম্রাজ্যের একটা প্রথা ছিল। রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড (এডওয়ার্ড আলবার্ট ক্রিশ্চিয়ান জর্জ
অ্যান্ড্রু প্যাট্রিক ডেভিড) ফলে একইবংশে অথবা অন্য বংশেও এই জাতীয় উপাধি ধারণ করা
হয়। ঐতিহাসিকরা পরবর্তীকালে কালানুক্রমিকতা রক্ষার জন্য সংখ্যা যোগ
করেছেন।
►গুপ্ত সাম্রাজ্য[Gupta
Dynasty] মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর উত্তর ভারতে
কুষাণরা ও দাক্ষিণাত্যে সাতবাহনরাজারা কিছুটা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি
স্থাপনে সক্ষমহয়েছিল
। কিন্তু খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের মধ্যভাগে উভয় সাম্রাজ্যের পতন হয় ।উত্তর-পশ্চিম ভারতে
বৈদেশিক আক্রমণ স্থিতিশীলতার পরিপন্থী ছিল । গুপ্তসাম্রাজ্যের অভ্যুত্থানের ফলে এই
রাজনৈতিক শুন্যতার অবসান হয় । কুষাণ ওসাতবাহন উভয় সাম্রাজ্যের বেশ কিছু অংশ গুপ্ত সাম্রাজ্যের
অন্তর্ভূক্ত হলেওঅয়তনের
দিক থেকে গুপ্ত সাম্রাজ্য মৌর্য সাম্রাজের তুলনায় ছোটো ছিল । গুপ্তসাম্রাজ্য প্রধানত
বিহার ও উত্তর প্রদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল । বিহার অপেক্ষাউত্তর প্রদেশই ছিল এই সভ্যতার
প্রাণকেন্দ্র এবং গোড়ার দিকে মুদ্রা ওশিলালিপি প্রধানত এখান থেকেই পাওয়া গেছে । গুপ্ত রাজারা সম্ভবত
বৈশ্যসম্প্রদায়ভুক্ত
ছিলেন এবং কুষাণ রাজাদের সামন্ত হিসাবে উত্তর প্রদেশে শাসনকরতেন। গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা
ছিলেনশ্রীগুপ্ত। তিনি ২৭৫
খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন।
►প্রথম
চন্দ্রগুপ্ত[Chandragupta I] (৩১৯/২০ খ্রিস্টাব্দ থেকে - ৩৩৫
খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত):গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা
ছিলেনপ্রথম
চন্দ্রগুপ্ত।তিনি লিচ্ছবি
রাজকন্যা কুমারদেবীকে বিবাহ করে গাঙ্গেও উপত্যকায় নিজপ্রাধান্য স্থাপন করেন । তাঁর রাজ্য
উত্তর প্রদেশের পূর্বাংশ, বিহার,
এমনকিবাংলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল । মৃত্যুর
পূর্বে তিনি পুত্র সমুদ্রগুপ্তকে নিজউত্তরাধিকারী বলে ঘোষণা করে যান ।
►সমুদ্রগুপ্ত[Samudragupta] (৩৩৫
খ্রিস্টাব্দ থেকে - ৩৮০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) : গুপ্ত রাজাদের মধ্যেসমুদ্রগুপ্ত ছিলেন
শ্রেষ্ঠ। শৌর্য-বীর্য, চারিত্রিক
দৃঢ়তা ও সংস্কৃতির প্রতি পৃষ্ঠপোষকতার জন্য তিনিভারত ইতিহাসে একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ
স্থান অধিকার করে আছেন । তাঁরসিংহাসন আরোহণের সঠিক সময় বলা কঠিন । সম্ভবত তিনি ৩২০
খ্রিস্টাব্দের পরসম্রাট
পদে অভিষিক্ত হন । ড. রোমিলা থাপারের মতে, তনি
৩৩৫ সাল নাগাদ পিতৃসিংহাসন
লাভ করেন।
(১)
সমুদ্রগুপ্তের রাজ্যজয় ও সাম্রাজ্য সীমা[Samudragupta
as a Conqueror]: সিংহাসনে বসার পরই
সমুদ্রগুপ্ত রাজ্যবিস্তারে মনযোগ দেন ।অশোকের শান্তি ও অহিংসা নীতি বর্জন করে
তিনি সামরিক শক্তির সাহায্যে একসাম্রাজ্যবাদী নীতি অনুসরণ করেন। সভাকবিহরিষেণের এলাহাবাদ প্রশস্তিথেকেতাঁর বিজয় কাহিনি
জানতে পারা যায় । এই লিপিতে অনেক পরাজিত রাজার নামেরউল্লেখ আছে । সমুদ্রগুপ্ত যে সব রাজ্যজয় করেছিলেন, তাদের মোটামুটিপাঁচভাগে ভাগ করা যেতে পারে ।
(ক) প্রথমভাগে রয়েছে গঙ্গা-যমুনার
মধ্যবর্তী এলাকার রাজ্যগুলি । এইঅঞ্চলের রাজাদের পরাজিত করে সমুদ্রগুপ্ত তাঁদের রাজ্য সরাসরি
গুপ্তসাম্রাজ্যে
অন্তর্ভুক্ত করেন ।
(খ) দ্বিতীয়ভাগে পড়ে পূর্ব হিমালয়স্থিত
রাজ্যগুলি এবং নেপাল, বঙ্গ, আসামপ্রভৃতি সীমান্তবর্তী অঞ্চলের রাজ্যসমূহ
। এখানকার রাজারা সমুদ্রগুপ্তেরবাহুবলের পরিচয় পেয়েছিলেন । পাঞ্জাবের কয়েকটি প্রজাতন্ত্রী
রাষ্ট্রকেও এইতালিকায়
অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
(গ) তৃতীয়ভাগে রয়েছে বিন্ধ্য অঞ্চলের
অটবিক রাজ্যগুলি ।
(ঘ) চতুর্থভাগে উল্লেখিত হয়েছে
দক্ষিণ-ভারতে পরাজিত ১২ জন রাজার নাম ।
(ঙ) সবশেষে পঞ্চমভাগে শক ও কুষাণ রাজাদের
নামের তালিকা ।
(ক)উত্তর ভারতে
সমুদ্রগুপ্ত যেসব রাজাকে পরাজিত করেন, তাঁদের
মধ্যেঅহিচ্ছত্ররাজঅচ্যুত (বেরিলী),
মতিল(উত্তরপ্রদেশের পশ্চিমাঞ্চল),
বলবর্মন(অনেকের মতে কামরূপ রাজ), চন্দ্রবর্মণ(বাঁকুড়া জেলার গোলকর্ণ) ওরুদ্রদেবের
(বুন্দেলখন্ড) নাম উল্লেখযোগ্য । (খ)দক্ষিণ ভারতে যে ১২ জন
পরাজিত রাজার নাম পাওয়া গেছে, তাঁরা
হলেনকোশলরাজ
মহেন্দ্র (মহানদী উপত্যকা),
মহাকান্তারের ব্যাঘ্ররাজ, কুরলের মন্তরাজ, পিষ্ঠপুর বা পিঠাপুরমের(গোদাবরী জেলা)মহেন্দ্রগিরি,
কোট্টুরের(উত্তর তামিলনাড়ু)স্বামীদত্ত, এরন্ডপল্লের(উত্তর তামিলনাড়ু)দমন, কাঞ্চীরপল্লবরাজ বিষ্ণুগোপ, অবমুক্তর নীলরাজ(কাশ্মীর নিকটবর্তী অঞ্চল), বেঙ্গীর(কৃষ্ণা ও গোদাবরীর মধ্যাঞ্চল)হস্তিবর্মণ, পালক্করাজ (নেলোর)উগ্রসেন, দেবরাষ্ট্রের(ভিজাগাপত্তম)কুবের ও কুন্তলপুরের (উত্তর আর্কট)ধনঞ্জয়।এই রাজাদের পরাজিত
করে সমুদ্রগুপ্ত তাঁদের রাজ্য ফিরিয়ে দেন । তাঁদেরমৌখিক অনুগত্য ও করদানের সম্মতির বেশি
অতিরিক্ত কিছু দাবি করেন । তিনিবুঝতে পেরেছিলেন উত্তর ভারত থেকে সুদূর দক্ষিণ ভারত শাসন করা
সম্ভব নয়।
এলাহাবাদ প্রশস্তি সভাকবি হরিষেণরচনাকরেনবলেএর মধ্যে কিছু
অতিশয়োক্তি থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করেন । পশ্চিম ভারতেতিনি শকদের ক্ষমতা বিনষ্ট করতে পারেন নি
বলে মনে হয় । কুষাণ রাজাদের সঙ্গেতাঁর সম্পর্কও সঠিকভাবে জানা যায় না । চৈনিক সূত্রে জানা যায়
সিংহলের রাজামেঘবর্ণ
বা মেঘবর্মণ তাঁর কাছে উপহার পাঠান এবং গয়াতে একটি বৌদ্ধমঠনির্মাণের অনুমতি চান । অনেকে মনে করেন,
যে দ্বীপের কথা চৈনিক সূত্রে বলাহয়েছে, তা আদৌ সিংহল নয় । এই সব সূত্রে কিছু
অতিশয়োক্তি থাকলেও সমুদ্রগুপ্ততাঁর দীর্ঘ ৪০ বছরের রাজত্বকালে অনেকগুলি বিজয় অভিযানে অংশ
নিয়ে এক বিশালসাম্রাজ্য
গড়ে তোলেন ।তাঁর
সাম্রাজ্য উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে দক্ষিণে নর্মদাতীর পর্যন্ত ও পূর্বে ব্রহ্মপুত্র নদী
থেকে পশ্চিমে চম্বল ও যমুনা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল ।অন্যান্যঅঞ্চলের রাজারা তাঁর অধীন না হলেও কর
দিতেন । তাঁর বিজয় নীতির ফলেগঙ্গা-যমুনা দোয়াব, রহিলখন্ড,
পূর্ব মালবের কিছু অংশও তাঁর
সাম্রাজ্যভুক্তছিল
। তা ছাড়া সমতট (পূর্ববঙ্গ), দাবাক
(সম্ভবত আসামের নওগাঁও), কামরূপ,
নেপাল, যৌধেয়, মদ্রক,
আভীর প্রভৃতি উপজাতিও তাঁর বশ্যতা
স্বীকার করেছিলেন ।
(২)
সমুদ্রগুপ্তের কৃতিত্ব[Achievement of
Samudragupta]: সমুদ্রগুপ্ত তাঁর
সামরিক অভিযানে সাফল্যলাভের কারণে ভারতেরইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় স্থান দখল করে
আছেন । (ক)তাঁর অসাধারণ
প্রতিভার জন্যই তিনি গাঙ্গেওউপত্যকার একটি ক্ষুদ্র রাজ্য থেকে বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপন করতে
সক্ষমহয়েছিলেন
। আর্যাবর্ত থেকে সুদূর দাক্ষিণাত্য পর্যন্ত সফল সামরিক অভিযানতাঁর প্রতিভার
স্বাক্ষর বহন করে । বিভিন্ন রাজাকে পরাজিত করে তিনি অশ্বমেধযজ্ঞ করেন । ঐতিহাসিকভি. স্মিথতাঁকেভারতের নেপোলিয়ানআখ্যা দিয়েছেন। (খ)তিনি কেবল সুদক্ষ
যোদ্ধাই ছিলেন না , তিনিসাহিত্যিক, শাস্ত্রজ্ঞ, সংগীতজ্ঞ ও শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবেওচিরস্মরণীয় হয়ে আছেন । সংস্কৃত পন্ডিতহরিষেণও বৌদ্ধ পন্ডিতবসুবন্ধুতাঁর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ
করেছিলেন ।ড.
রমেশ চন্দ্র মজুমদারেরমতে, সমুদ্রগুপ্তের
অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভা ভারতের ইতিহাসে এক নব যুগের সূচনা করেছিল।
►দ্বিতীয়
চন্দ্রগুপ্ত[Chandragupta II Vikramaditya](৩৮০ খ্রিস্টাব্দ থেকে - ৪১৫ খ্রিস্টাব্দ
পর্যন্ত): সমুদ্রগুপ্তের পুত্র দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকাল
গুপ্তযুগের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায় । “দেবীচন্দ্রগুপ্তম্” নাটক থেকে জানা যায় সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর তাঁর বড় ছেলেরামগুপ্তসিংহাসনে বসেন । তিনি
একজন শক রাজার হাতে পরাজিত হয়ে নিজ স্ত্রী ধ্রুবদেবীকে তাঁর হাতে সমর্পণ করেন ।
তখনদ্বিতীয়
চন্দ্রগুপ্তসেই রাজাকে হত্যা করে রানির মর্যাদা রক্ষা করেন । পরে
রামগুপ্তকে হত্যাকরে
ওধ্রুবদেবীকে বিবাহ
করে সিংহাসন দখল করেন । অনেকে এই কাহিনি সত্য বলেমনে করেন । (১)
রাজ্যজয় নীতি:দ্বিতীয়
চন্দ্রগুপ্ত পিতারদিগ্বিজয়ী
নীতি নুসরণ করেন । তিনি কেবলমাত্র বাহু বলের দ্বারাই রাজ্য জয়করেন নি ।তিনি ইউরোপের হ্যাপস্বার্গ ও বুঁরবো
রাজাদের মতো বৈবাহিকসম্বন্ধ
স্থাপন করেও রাজ্য বিস্তার করেন । তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বহল শকদের যুদ্ধে
পরাজিত করা । যুদ্ধ জয়ের স্মৃতিতে তিনি এক রৌপমুদ্রাপ্রচলন করেন। শকদের পরাজয়ের ফলে ভারতের
উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত সুরক্ষিত হয় ।তাছাড়া এর ফলে ভূমধ্যসাগর অঞ্চলে ভারতীয় বণিকদের প্রসার ঘটে ।
তিনি বাকাটকরাজ
দ্বিতীয়রুদ্রসেনের
সঙ্গে নিজকন্যাপ্রভাবতীর বিবাহ দিয়েদাক্ষিণাত্যেরপশ্চিম অঞ্চলে নিজ
প্রাধান্য স্থাপন করেন । বিবাহের পাঁচ বছর পররুদ্রসেনের মৃত্যু হলে প্রভাবতী নিজ
পুত্রের অবিভাবক রূপে রাজত্ব করেন ।ফলে বাকাটক রাজ্য কার্যত গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় ।
(২) বিক্রমাদিত্য বতর্ক:চন্দ্রগুপ্ত বিভিন্ন
মুদ্রায়বিক্রমাদিত্যউপাধি ব্যবহার করেছেন
। শকদের পরাজিত করে তিনি “শকারি”
উপাধি গ্রহণ করেছিলেন । তাই অনেকের মতে
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত হচ্ছেনবিক্রমাদিত্য শকারি, যাঁর
রাজসভা কালিদাস ও বরাহমিহিরসহ নয়জন রত্ন অলঙ্কৃতকরতেন । অবশ্য নবরত্নের সবাই তাঁর
সমসাময়িক ছিলেন কিনা, এবং বিক্রমাদিত্য ওচন্দ্রগুপ্ত একই
ব্যক্তি ছিলেন কি না তা সুনিশ্চিতভাবে বলা কঠিন ।চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালেই বিখ্যাত
চৈনিক পর্যটক ফা-হিয়েন ভারতেআসেন ।তাঁর রাজত্বকাল সংস্কৃতির ক্ষেত্রে চরম
উৎকর্ষতার জন্য ভারতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে ।
(৩)
মূল্যায়ন[Evaluation]: সমুদ্রগুপ্তের পাশেচন্দ্রগুপ্তকে অনেকাংশে ম্লান বলে মনে
হতে পারে । সমুদ্রগুপ্তের মতোচমকপ্রদ সামরিক প্রতিভা তার অবশ্যই ছিল না । নতুন করে রাজ্য জয়
করার খুবএকটা
প্রয়োজন হয়নি । কিন্তু শকদের পরাজিত করে এবং পশ্চিম মালব ও গুজরাট জয়করে তিনি তাঁর সামরিক
প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন । উজ্জয়িনী ছিল মালবেররাজধানী । সমুদ্রগুপ্তের রাজ্য জয় নীতি
সামরিক শক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল ।কিন্তু দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত সামরিক শক্তির সঙ্গে বৈবাহিক
সম্বন্ধ নীতিগ্রহণ
করেছিলেন । তিনি তাঁর পিতার রাজ্যজয় নীতির সম্পূর্ণতা দিতে পারেন নি ।উত্তরাধিকার সূত্রে
যে সাম্রাজ্য পেয়েছিলেন, মোটের
উপর তা নিয়েই সন্তুষ্টছিলেন । কিন্তু সেই সাম্রাজ্য যাতে সুশাসিত হয়, সে দিকে তাঁর নজর ছিল ।সাহিত্য ও সংস্কৃতির
পৃষ্ঠপোষক হিসাবে তাঁর পিতার চেয়ে কোনো অংশে কম ছিলেননা; বরং অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন । তবে রোমিলা থাপারের মতে, গুপ্ত সভ্যতা ওসংস্কৃতির উৎকর্ষতা ও সুফল কেবল মাত্র
সমাজের উঁচু তলার মানুষের মধ্যেসীমাবদ্ধ ছিল ।
►পরবর্তী
গুপ্তরাজন্যবর্গ :
(১) দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের পর তাঁর পুত্র
কুমারগুপ্ত [Kumaragupta I] (৪১৫
খ্রিস্টাব্দ থেকে - ৫৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) মগধের সিংহাসনে আরোহণকরেন । তিনি গুপ্ত
সাম্রাজ্যের সীমানা অক্ষুন্ন রাখেন । নতুন করে কোনোরাজ্য জয় না করলেও তিনি অশ্বমেধের যজ্ঞ
করেছিলেন । তাঁর সময়ে উত্তর-পশ্চিমভারতে হুন আক্ক্রমণ হয় । যুবরাজ স্কন্দগুপ্ত হূনদের পরাজিত করে
আসন্ন বিপদথেকে
ভারতকে রক্ষা করেন ।
(২) গুপ্তযুগের শেষ শক্তিশালী সম্রাট
ছিলেন স্কন্দগুপ্ত [Skandagupta] ।তিনি ৪৫৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৪৬৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব
করেন । হুনআক্রমণ
প্রতিহত করার জন্য তিনি বিক্রমাদিত্য উপাধি গ্রহণ করেছিলেন । হুনআক্রমণ প্রতিহত করার
জান্য রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁকে “ভারতের
রক্ষাকারী” বলে অভিহিত করেছেন ।
তিনি সুশাসক ও প্রজাবৎসল নৃপতি ছিলেন । জুনাগড় লিপিথেকে জানা যায় তিনি সৌরাষ্ট্রের সুদর্শন
হ্রদ সংস্কার করেন । তাঁর মৃত্যুরপর গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয় ।
►গুপ্তসাম্রাজ্যের
পতনের কারণ[Cause of Decline of Gupta
Dynasty] :
(১) অন্যান্য স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের মতো
গুপ্ত শাসনের স্থায়িত্বনির্ভরশীল ছিল সম্রাটের সামরিক ও প্রশাসনিক দক্ষতার উপর ।
কিন্তুস্কন্দগুপ্তের
পরবর্তী গুপ্তরাজাদের সেই যোগ্যতা না থাকায় পতন শুরু হয় ।
(২) পরবর্তীকালে সিংহাসনকে কেন্দ্র করে
উত্তরাধিকারীদের মধ্যে যে কলহ ওবিরোধ দেখা দেয়, তা
গুপ্ত সাম্রাজ্যের ভিত দুর্বল করে দিয়ে ছিল ।
(৩) প্রাদেশিক শাসক ও সামন্ত প্রভুরা এই
দুর্বলতার সুযোগ গ্রহণ করেন ।ফলে বিচ্ছিন্নতাকামী প্রবণতা শক্তি সঞ্চয় হাতেথাকে । কাথিয়াবাড়েরশাসনকর্তা বুধগুপ্ত
মহারাজ উপাধি ধারণ করে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতে শুরুকরেন । দক্ষিণ কোশল ও নর্মদা ঞ্চলের
রাজারা নামে মাত্র গুপ্ত সম্রাটেরঅধীনে ছিলেন । বাংলাও স্বাধীন হয়ে যায় । পরবর্তী গুপ্ত
সম্রাটরা সামরিকশক্তিকে
অবহেলা করে বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে অহিংস নীতি গ্রহণ করেন । ফলে হুনরাযখন আক্রমণ করে,
তখন সেই আক্রমণ প্রতিহত করার মত ক্ষমতা
আর তাদের ছিল না ।
(৪) অর্থনৈতিক সংকট গুপ্ত সাম্রাজ্যের
ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয় । নানাকারণে গুপ্তযুগে ভারতের বহির্বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস
পায় । ফলেবিদেশ
থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ভারতের অর্থনীতিকে একদা শক্তিশালী করত, তার ঘাটতি দেখা দেয়। রাজস্বের পরিমাণ
কমে যায় । মুদ্রা ব্যবস্থায় ক্রমাবনতিদেখা দেয় । অর্থনৈতিক বিপর্যয় গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রাণশক্তি
নিঃশেষ করেদেয়
।
(৫) এই পরিস্থিতিতে বৈদেশিক আক্রমণ গুপ্ত
সাম্রাজ্যের পতনকে ত্বরান্বিত করে ।
মৌর্য
সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা- চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য রাজধানী- পাটলীপুত্র প্রথম সর্বভারতীয় রাষ্ট্র/ ভারতীয়
উপমহাদেশে প্রথম সাম্রাজ্য- মৌর্য সাম্রাজ্য প্রথম সর্বভারতীয় রাষ্ট্র/ ভারতীয়
উপমহাদেশে প্রথম সাম্রাজ্য স্থাপন করেন- চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সম্রাট অশোক- মৌর্য সম্রাট কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে অশোক
বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন
মৌর্যবংশের রাজাদের ক্রম (সকলের সময়েই
বাংলা মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল, এমন
নয়) চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য> বিন্দুসর> সম্রাট অশোক> দাশরথ>
সম্প্রতি> সালিশুকা> দেববর্মণ>
শতধনবান> বৃহদ্রথা
গুপ্ত
সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা- শ্রীগুপ্ত (উত্তরে
শ্রীগুপ্ত না থাকলে চন্দ্রগুপ্ত বা প্রথম চন্দ্রগুপ্ত উত্তর করতে হবে) গুপ্ত বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা- সমুদ্রগুপ্ত চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যর রাজধানী- পাটলীপুত্র সমুদ্রগুপ্তের মুদ্রা- অশ্বমেধ পরিক্রমা ফা-হিয়েন ভারতবর্ষে আসেন- দ্বিতীয়
চন্দ্রগুপ্তের আমলে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের উপাধি-
বিক্রমাদিত্য, সিংহবীর কালিদাস- গুপ্ত যুগের কবি কালিদাসের মহাকাব্য- মেঘদূত
গুপ্তবংশের রাজাদের ক্রম (সকলের সময়েই
বাংলা গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল, এমন
নয়) শ্রীগুপ্ত> ঘটোৎকচ> প্রথম
চন্দ্রগুপ্ত> নিশামুসগুপ্ত>
সমুদ্রগুপ্ত> রামগুপ্ত> দ্বিতীয়
চন্দ্রগুপ্ত> প্রথমকুমারগুপ্ত>
স্কন্ধগুপ্ত> পুরুগুপ্ত> দ্বিতীয়
কুমারগুপ্ত> বুদ্ধগুপ্ত>
নরসিংহগুপ্ত বালাদিত্য> তৃতীয় কুমারগুপ্ত> বিষ্ণুগুপ্ত> বৈন্যগুপ্ত> ভানুগুপ্ত