দ্রোণাচার্য ছিলেন ভরদ্বাজ মুনির পুত্র। আশ্রমে পড়াশোনা করা ছাড়াও তিনি
সেখানে থেকেই তপস্যা করেছিলেন। দ্রোণাচার্যের বিয়ে হয়েছিল শরদ্বান মুনির
কন্যা এবং কৃপাচার্যের বোন কৃপীর সঙ্গে। তাঁর ছেলের নাম ছিল অশ্বত্থামা।
দ্রোণাচার্য মহেন্দ্র পর্বতে গিয়ে শ্রী পরশুরামের কাছ থেকে অস্ত্র ও
শস্ত্র প্রয়োগ এবং সংহার বিদ্যা জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।
মহাভারতের যুদ্ধে দ্রোণাচার্য
মহাভারতের যুদ্ধে দ্রোণাচার্য
মহাভারতের যুদ্ধে দ্রোণাচার্য কৌরবদের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন। ভীষ্ম
শরশয্যায় যাওয়ার পর কর্ণের নির্দেশে দ্রোণাচার্যকে সেনাপতি করা হয়। গুরু
দ্রোণের ক্রমবর্ধমান শক্তি দেখে পান্ডবদের দলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
দ্রোণাচার্য ও তাঁর পুত্র অশ্বত্থামার রুদ্র রূপ দেখে পাণ্ডবরা তাদের
পরাজয়ের কথা ভেবেছিলেন।
বুদ্ধ পূর্ণিমা ২০২০:বৈশাখী পূর্ণিমার দিনেই সত্য জ্ঞান লাভ করেছিলেন
বুদ্ধ, জানুন এর শুভ সময় ও গুরুত্ব
শ্রীকৃষ্ণ ছলনার আশ্রয় নিয়েছিলেন
শ্রীকৃষ্ণ ছলনার আশ্রয় নিয়েছিলেন
পাণ্ডবদের এমন পরিস্থিতি দেখার পর, শ্রীকৃষ্ণ ছলনার আশ্রয় নিয়েছিলেন।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে দ্রোণাচার্য অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠলে দ্রোণকে বধ করার
জন্য পাণ্ডবগণ শ্রীকৃষ্ণের সাথে পরামর্শ করেন। আর তখন শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবদের
বলেন কোনও ভাবে যদি গুরু দ্রোণের কানে অশ্বত্থামার মৃত্যুর খবর পোঁছানো
যায় তাহলে সে সময় ধৃষ্টদ্যুম্ন তাঁকে হত্যা করবে।
শ্রীকৃষ্ণ ও ভীষ্ম
এই পরিকল্পনা অনুসারে
যুদ্ধে অশ্বত্থামা নিহত হওয়ার খবরটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে ধর্মরাজ
যুধিষ্ঠির মিথ্যা বলতে রাজি হননি।
তাই, শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শ মতো ভীম পাণ্ডবপক্ষের ইন্দ্রবর্মার অশ্বত্থামা
নামক হাতীকে হত্যা করেন। আর সেখানে তখন উপস্থিত ছিলেন যুধিষ্ঠির। আর
একমাত্র গুরু দ্রোণ যুধিষ্ঠিরের কথাকেই বিশ্বাস করতেন। তাই যুধিষ্ঠির
দ্রোণের উদ্দেশ্যে 'অশ্বত্থামা হতঃ- ইতি গজ' (অশ্বত্থামা নামক হাতী নিহত
হয়েছে) বাক্য উচ্চারণ করেন। 'ইতি গজ' শব্দটি আস্তে বলাতে দ্রোণচার্য মনে
করেন যে তাঁর পুত্র অশ্বত্থামার মৃত্যু সংবাদ দেওয়া হয়েছে।
নিরস্ত্র দ্রোণাচার্যের উপর আক্রমণ
নিরস্ত্র দ্রোণাচার্যের উপর আক্রমণ
ছেলের মৃত্যুর সংবাদ শোনার পরে দ্রোণাচার্য তাঁর অস্ত্র ত্যাগ করেন। এই
সুযোগের সদ্ব্যবহার করে দ্রৌপদীর ভাই ধৃষ্টদ্যুম্ন নিরস্ত্র দ্রোণাচার্যের
শিরশ্ছেদ করেন।
অশ্বত্থামা এই কৌশল সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন
অশ্বত্থামা এই কৌশল সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন
অশ্বত্থামা যখন এই ঘটনাটি জানতে পেরেছিলেন, তখন তাঁর ক্রোধ অত্যধিক হয়ে
ওঠে। শোক ও ক্রোধে ভরপুর অশ্বত্থামা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তিনি পাণ্ডবদের
কোনও পুত্রকে জীবিত রাখবেন না। পিতার প্রতারণামূলক মৃত্যুর প্রতিশোধ
নেওয়ার জন্য অশ্বত্থামা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। পাণ্ডব মহাভারতের যুদ্ধে
জিতেছিলেন ঠিকই, কিন্তু অশ্বত্থামা দ্রৌপদীর একজন পুত্রকেও জীবিত রাখেন নি।
তথ্য সূত্র https://bengali.boldsky.com
অমর চিত্র কথা ৫১ নং ঝাঁসির রানীর পর ৫৭ পোস্ট করতে হচ্ছে... কারন এর মাঝে
কবীর ছাড়া বাকি গুলি সম্ভবত বাংলায় প্রকাশিত হয়নি.........
দীপিকার
নাক কাটার হুমকি যারা দিয়েছিল, মনে হচ্ছে, নাকের বদলে নরুন পেয়ে টাক
ডুমাডুম বাদ্যি বাজিয়ে তাদের হয়তো সন্তুষ্ট থাকতে হবে। কেননা, সবকিছু
ঠিকঠাক এগোলে কাটা যাবে ‘পদ্মাবতী’র দীর্ঘ ই-কার। ‘পদ্মাবতী’র রূপান্তর ঘটে
প্রকাশ পাবে ‘পদ্মাবত’। সূর্পণখা হতে হবে না দীপিকাকে।
সেন্সর বোর্ডের এই সমঝোতা সূত্র অবশ্য রাজস্থানের করণি সেনার না-পছন্দ। তারা সিনেমাটা নিষিদ্ধ করার দাবিতে এখনো অনড়।
ঝাঁসিবাসীর
মধ্যে অবশ্য এ নিয়ে কোনো হেলদোল নেই। তাদের ভাবনাজুড়ে শুধু তাদের হৃদয়ের
রানির সম্মান। প্রার্থনা একটাই, রানির কোনো রকম সম্মানহানি যেন না হয়।
উত্তর
প্রদেশের যে অংশটা মধ্যপ্রদেশের ঘাড় বেয়ে নেমে এসেছে, ঝাঁসি জায়গাটা ঠিক
সেখানে। সেখানকার লোকজনের মনে রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের আসন কতটা পরিপাটি করে
পাতা, ঝাঁসি না গেলে তা বোঝা যেত না। পদ্মাবতী অথবা পদ্মিনীর সঙ্গে
লক্ষ্মীবাঈয়ের তুলনাতেও শহরবাসী আগ্রহী নয়। রানি পদ্মিনী বা পদ্মাবতী কতটা
বাস্তব ও কতটাই বা কল্পনা, তা নিয়ে বিতর্ক বিস্তর। লক্ষ্মীবাঈয়ের অস্তিত্ব,
বীরত্ব ও নাতিদীর্ঘ জীবনের ইতিহাস নিয়ে কিন্তু বিতর্কের বিন্দুমাত্র অবকাশ
নেই।
দীপিকা পাড়ুকোন যেমন ‘পদ্মাবতী’, কঙ্গনা রানাবত তেমনই ঝাঁসির
রানি। কিন্তু লক্ষ্মীবাঈয়ের আদি নাম যে ‘মণিকর্ণিকা’, আগে তা জানা ছিল না। গাইডের ব্যাখ্যা এই রকম, লক্ষ্মীবাঈয়ের
জন্ম বারানসিতে। বারানসির বিখ্যাত মণিকর্ণিকা ঘাটে বাবা কাজ করতেন। সেই
ঘাটের নামেই মেয়ের নাম রেখেছিলেন। ‘মণিকর্ণিকা’ ক্রমে ছোট হয়ে হলো ‘মনু’।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে ঝাঁসির রাজা গঙ্গাধর রাওয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল মনুর।
সেই থেকে ‘মণিকর্ণিকা’ অস্তে গেল। উদয় হলেন রানি লক্ষ্মীবাঈ।
ঝাঁসির
গাইডদের মুখে রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের মাহাত্ম্য ও মনে বাসা বেঁধেছে
‘মণিকর্ণিকা’র প্রতীক্ষা। হবে নাইবা কেন? ৩০ বছর পূর্ণ না-হওয়া কোনো রমণী
শিশুসন্তানকে পিঠে বেঁধে ঘোড়ার লাগাম দাঁতে চেপে দুহাতে খোলা তলোয়ার নিয়ে
ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, সতী-সাবিত্রীর দেশ ভারতে এমন ছবি যে বিরল।
সেই ছবি যদি জীবন্ত হয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে, ইতিহাস তাহলে কল্পনার জগৎ
থেকে বাস্তবে নেমে আসে। সিপাহি বিদ্রোহ যদি হয়ে থাকে ভারতের স্বাধীনতা
অর্জনের প্রথম সংগ্রাম, অনন্যা বীরাঙ্গনা লক্ষ্মীবাঈ তাহলে দেশের প্রথম
নারী স্বাধীনতাযোদ্ধা। বইয়ের পাতা থেকে সিনেমার পর্দায় ইতিহাসের সেই নেমে
আসার প্রতীক্ষায় দিন গুনছে গোটা ঝাঁসি। শুধু ঝাঁসিই বা বলি কী করে,
প্রতীক্ষায় রয়েছে দেশের স্বাধীনতাকামী তামাম নারীসমাজ।
তাঁকে নিয়ে
ঝাঁসিবাসীর গর্বের কারণ বহু। স্বামীর মৃত্যুর পর রাজপাট সামলেছেন। প্রজাদের
মঙ্গলের চেষ্টা করে গেছেন আমৃত্যু। আরও অনেকের মতো আত্মহননের পথে এগোননি।
জহরব্রত পালন করেননি। ভীরু মনে দুবেলা মরার অপেক্ষা করেননি। বরং ঝাঁসিকে
স্বাধীন রাখতে হাতে তুলে নিয়েছেন অস্ত্র। গড়ে তুলেছেন প্রমীলা বাহিনী।
যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতির ভূমিকা নিয়েছেন। এবং লড়তে লড়তে ক্ষতবিক্ষত হয়ে
গোয়ালিয়রের এক প্রান্তে পৌঁছে নদীর কিনারে এক সাধুকে অনুরোধ করেছেন তাঁর
জন্য চিতা সাজাতে। লক্ষ্মীবাঈ চাননি ইংরেজরা তাঁর কেশাগ্র স্পর্শ করুক।
করতেও পারেনি।
মাত্র দেড় শ বছর আগের ঘটনা। ১৮২৮ সালের ১৯ নভেম্বর জন্ম, মৃত্যু ১৮৫৮ সালের ১৮ জুন। ক্ষণজন্মা নারীর ক্ষণিকের জীবন!
সাহস
ও বীরত্ব তো বটেই, রানি লক্ষ্মীবাঈ আজকের দিনে আরও প্রাসঙ্গিক তাঁর
অত্যাধুনিক মন ও ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতার জন্য। হিন্দু ও মুসলমানে কোনো
বিভেদ কোনো দিন তিনি করেননি। তাঁর রাজত্বে মন্দির-মসজিদ পাশাপাশি তৈরি যেমন
হয়েছে, তেমনই পূর্ণ দায়িত্বে বহাল রেখেছিলেন মুসলমান সেনাপতিদের। দুর্গ
রক্ষার যুদ্ধে নিহত মুসলমান ও হিন্দু যোদ্ধাদের যে অশ্বত্থগাছের তলায় কবর ও
দাহ করা হয়েছিল, প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসের মেলায় দুই ধর্মের মানুষ সেখানে
জড়ো হন শ্রদ্ধা জানাতে। আজ পর্যন্ত কোনো তিক্ততা দেখা যায়নি।
দুর্গে
প্রতিদিন সন্ধেয় আলো ও ধ্বনির মূর্ছনায় জীবন্ত হয়ে ওঠে দেড় শ বছর আগের
ঝাঁসির ইতিহাস ও রানির জীবন-আলেখ্য। ভাষ্যপাঠে দিকপাল অভিনেতা ওমপুরী ও
অভিনেত্রী সুস্মিতা সেন। গাইড বললেন, রানির ভূমিকায় কণ্ঠদানের জন্য
সুস্মিতা একটা টাকাও গ্রহণ করেননি। কেন বলুন তো?
উত্তরটাও
গাইডই দিলেন। ‘রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের মতো সুস্মিতা সেনেরও জন্ম ১৯ নভেম্বর।
তাই। এত সম্মান ও ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে তৈরি সিনেমা যেন ‘পদ্মাবতী’র মতো
অনাবশ্যক কোনো বিতর্ক ও বিড়ম্বনা সৃষ্টি না করে। আমাদের প্রার্থনা ও কামনা
এটুকুই।’
অমর চিত্র কথা ৪৫ নং এর পর ৫০ পোস্ট করলাম, কারন এই চারটির মধ্যে দুটি মাত্র বাংলায় প্রকাশিত হয়ে ছিল... এই দুটি বাংলা এখনো আমার সংগ্রহে নেই... পরে পেলে হয়তো পোস্ট করে দেবো ।
বাল্মীকি ও তাঁরাবাঈ বাংলায় সম্ভবত প্রকাশিত হয়নি ।
রাম শাস্ত্রী ছিলেন এক আদর্শ মানুষ । পেশোয়ারের দরবারে তিনি দীর্ঘকাল প্রধান বিচারপতির কাজ কঠিন হাতে পালন করে গেছেন...। শাস্ত্রীজীর বাল্য কাল সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়না ... এই বই তে ঐতিহাসিকেরা শোনা কথার উপর অনেক খানি নির্ভর করে লিখেছেন...।
বিচারপতির কাজ তাঁর জীবনে খুব একটি মসৃণ ছিল না, মাঝে মধ্যেই তাঁকে কঠিন অগ্নি পরিক্ষার মুখো মুখি হতে হয়েছে... অসম্ভব আত্মপ্রত্যয়ে তিনি বার বার সেই পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন.........
এই বইটি ৩ প্রকার ভাবে প্রকাশিত হয়ে ছিল প্রচ্ছদের ছবি গুলি দিলাম ।
জাতক হল ভগবান শাক্যমুনি বুদ্ধের পূর্বজন্মের কাহিনির সঙ্কলন। বুদ্ধ
মহাধম্মপাল জাকত (৪৪৭) তার পিতাকে শুনিয়ে স্বদ্ধর্মে দীক্ষা দিয়েছিলেন।
স্পন্দন জাতক (৪৭৫), দদ্দভ জাতক (৩২২), লটুকিক জাতক (৩৫৭), বৃক্ষধর্ম জাতক
(৭৪) ও সম্মোদমন জাতক ( ৩৩) এই পাঁচটি জাতক শুনিয়ে শাক্য ও কোলিয়দের
বিরোধ নিবারণ করেছিলেন। চন্দকিন্নর জাতক (৪৮৫) যশোধরাকে শুনিয়ে পাতিব্রত ধর্ম যে পূর্বজন্ম সংস্কারজ তা বুঝিয়েছিলেন। জাতক বৌদ্ধধর্মের নবাঙ্গের এক অঙ্গ এবং সুত্তপিটক এর অন্তর্গত খুদ্দকনিকায় এর অন্যতম একটি শাখা। ত্রিপিটকের অন্যান্য গ্রন্থেও জাতকের অনেক রেফারেন্স পাওয়া যায়।
পঞ্চতন্ত্র, ঈশপের গল্পের মতোই জাতকের
গল্পগুলো অসাধারণ সাহিত্যরসে ভরপুর। জাতকের কাহিনীগুলো বিভিন্ন বয়সী
পাঠকদের কাছে আজও সমান জনপ্রিয়। তাই গল্পগুলো এখন আর বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ
না থেকে কমিকের বইয়ে বা কখনও অ্যানিমেশন ছবিতে জীবন্ত হয়ে আছে। জাতকের
কাহিনীগুলো এখনও নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হচ্ছে।
জাতক কী?
‘জাতক’
শব্দের অর্থ জন্মগ্রহণকারী। জাতক হলো গৌতম বুদ্ধের বিভিন্ন জন্মের কাহিনী
রচিত গল্প সঙ্কলন। শোনা যায়, বুদ্ধদেব নিজেই জাতকের কাহিনীগুলো
শুনিয়েছিলেন। বুদ্ধদেবের পূর্বজন্মের
নানা কাহিনী নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে জাতকের ৫৪৭টি গল্প। বুদ্ধত্ব লাভের পর গৌতম
বুদ্ধ তার অতীত জীবনের কথা স্মরণ করার ক্ষমতা অর্জন করেন। তিনি শিষ্যদের
সাথে ধর্মালোচনার সময় প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হিসেবে তার পূর্বজন্মের নানা ঘটনার
কথা উল্লেখ করতেন। সেসব ঘটনার সঙ্কলনই জাতক সাহিত্য হিসেবে পরিচিত।
পালি ভাষায়
জাতকের এই কাহিনীগুলোকে বলা হয় 'জাতকত্থ বন্ননা'। ধারণা করা হয়, সম্রাট
অশোকের পুত্র মহেন্দ্র বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য যখন সিংহল পরিভ্রমণ করেন,
তখন শিষ্যদের জ্ঞানদানের জন্য তার সাথে ছিল জাতকের কাহিনীগুলো। সেই মূল
গ্রন্থটি এখন বিলুপ্ত। সিংহলি ভাষায় যে জাতক প্রচলিত আছে, বর্তমানের
'জাতকমালা' তারই অনুবাদ বলে অনেকেই মনে করেন। অনেকের মতে, 'জাতক' হলো
পৃথিবীর সমস্ত ছোট গল্পের উৎস।
জাতকের সময়
জাতক গল্পের
অধিকাংশই প্রাক-বুদ্ধ যুগের। পঞ্চতন্ত্রসহ বিভিন্ন ভারতীয় সঙ্কলনেও এইসব
কাহিনীর কিছু কিছু পাওয়া যায়। দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার বাইরেও জাতকের
বেশ কিছু কাহিনীর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। মানবজাতির জ্ঞান ও নৈতিকতা অর্জনের
জন্য জাতক কাহিনীগুলো রচিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। জাতকের এই গল্পগুলো
দীর্ঘকাল গুরুশিষ্য পরম্পরায় শ্রুতি থেকে স্মৃতিতে সংরক্ষিত ছিল।
জাতকের বিভিন্ন কাহিনীর চিত্ররূপ স্থান পেয়েছে শ্রীলঙ্কার এক বৌদ্ধ বিহারে
খ্রিস্টপূর্ব
তৃতীয় শতকে সম্রাট অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত তৃতীয় বৌদ্ধ
মহাসঙ্গীতি কালে জাতক গ্রন্থিত হয়। পালি ভাষাতেই জাতকের গল্পগুলো লিখিত
হয়েছিল। বুদ্ধঘোষ রচিত জাতকত্থ বণ্ণনা নামক গ্রন্থে ৫৪৭টি জাতক কাহিনী
অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৮৯৫ থেকে ১৯০৭ সাল পর্যন্ত জাতকের কাহিনীগুলো ইংরেজি
ভাষায় অনূদিত হয়। পরবর্তীকালে বাংলাসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় তা অনূদিত
হয়। বাংলা ভাষায় জাতকের কাহিনীগুলো অনুবাদ করেন ঈশান চন্দ্র ঘোষ।
পঞ্চতন্ত্র, ঈশপের গল্পের মতোই জাতকের কাহিনীও সবধরনের পাঠকের মাঝে সমান জনপ্রিয়;
বাংলা
ভাষায় রচিত জাতকের গল্প সঙ্কলনেও ৫৪৭টি জাতক কাহিনী স্থান পায়। কিন্তু
ত্রিপিটকের সূত্তপিটক মতে, বুদ্ধদেব ৫৫০ বার জন্ম নিয়েছিলেন। সে হিসেবে
জাতক সংখ্যা ৫৫০টি হওয়া উচিত। কিন্তু জাতকের তিনটি কাহিনী সম্পর্কে কোনো
তথ্য পাওয়া যায়নি। আবার অনেকের মতে, জাতকে
যে ৫৪৭টি গল্প আছে তার অনেকগুলোই পরবর্তী সময়ে সংযোজিত হয়েছে। তাই কোন
জাতকগুলো প্রাচীনতম অর্থাৎ বুদ্ধেরই বলা, তা চিহ্নিত করা খুব কঠিন। তবে
গবেষকগণ কিছু কিছু গল্পের ভাব ও ভাষা বিচার করে কয়েকটি কাহিনীকে চিহ্নিত
করতে পেরেছেন।
জাতক গল্পের মূল বিষয়বস্তু
বুদ্ধদেব নির্বাণ
লাভ করার অল্প কিছুদিন পর থেকেই তার অনুগামীরা জাতকের কাহিনী শোনাতেন। এসব
কাহিনী তারাই চিরস্মরণীয় করার ব্যবস্থা করেন। আত্মজীবনীমূলক এই কাহিনীগুলোর
নৈতিক মূল্য রয়েছে একজন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর কাছে। গৌতম বুদ্ধের জীবনের
বিভিন্ন ঘটনা, বৈশিষ্ট্য এবং পরিস্থিতি জাতকে বর্ণিত কাহিনীগুলো দিয়ে
আংশিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। জাতকের গল্পে তিনটি বিষয়ের প্রাধান্য দেয়া হয়। এ কারণে একটি জাতক গল্পকে তিনটি অংশে ভাগ করা হয়।
জাতকের প্রতিটি কাহিনীতেই পাপ-পুণ্য, ধর্ম-অধর্মের কথা বলা হয়েছে;
প্রথম
অংশে, গৌতম বুদ্ধ গল্পটি কোথায়, কখন, কাকে বলেছেন, তার নির্দেশনা থাকে।
গল্পের এ ধরনের ভূমিকাকে প্রত্যুৎপন্ন বস্তু বলা হয়। গল্পের দ্বিতীয় অংশে
অতীত জন্ম পটভূমিকা তুলে ধরে বুদ্ধ জাতকটি তার অনুসারীদের বলে থাকেন। এটি
গল্পের মূল আখ্যান। গল্পের এ অংশকে বলা হয় অতীত বস্তু বা মূল
বিষয়বস্তু। গল্পের শেষ অংশে অতীত জীবনের সাথে বর্তমান জীবনের যোগসূত্র
স্থাপন করা হয়। এ অংশকে বলা হয় সমাধান তত্ত্ব।
গল্পে জাতকের যেসব নাম পাওয়া যায়
জাতকের গল্পগুলো বুদ্ধদেব তার পূর্বের জন্মগুলোতে
কখনও মানুষ, কখনও বা পশু, আবার কখনও পাখি হয়ে জন্মেছেন। পূর্বজন্মের এসব
কাহিনী নিয়েই সৃষ্টি হয়েছে জাতক। প্রচলিত গল্পগুলোতে আর যেসব চরিত্র পাওয়া
যায়, তাদের মধ্যে অগস্ত্য, অপুত্রক, অধিসহ্য, শ্রেষ্ঠী, আয়ো, ভদ্রবর্ণীয়,
ব্রহ্ম, ব্রাহ্মণ, বুদ্ধবোধি, চন্দ্রসূর্য, দশরথ, গঙ্গাপাল, হংস, হস্তী,
কাক, কপি, ক্ষান্তি, কাল্মষ পিন্ডি, কুম্ভ, কুশ, কিন্নর, মহাবোধি, মহাকপি,
মহিষ, মৈত্রীবল, মৎস্যমৃগ, মধ্যদেবীয়, পদ্মাবতী, রুরু, শত্রু, শারভ, শশ,
শতপত্র, শিবি, সুভাস, সুপারগ, সূতসোম, শ্যাম, উন্মাদয়ন্তী, বানর
উল্লেখযোগ্য।
নীতিবোধের অনুপ্রেরণা থেকে রচিত হয়েছে জাতক কাহিনী
জাতকের
কাহিনীগুলো মানুষের মধ্যে মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবতা, সৌহার্দ্যের মতো
সম্পর্কগুলো গড়ে তুলেতে যেমন উদ্বুদ্ধ করে, তেমনি দয়াবান, সৎ ,আদর্শবান ও
নীতিবোধসম্পন্ন মানুষ গড়ে ওঠার মতো নৈতিক শিক্ষা দিয়ে থাকে। পরমতসহিষ্ণু ও
পরধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিক্ষা দেয়।
জাতকের গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে কমিকস
সাহিত্য
হিসাবেও জাতকের গল্পগুলো কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এর গল্পের গঠন এবং
উপস্থাপনের ভঙ্গিমার কারণে সব বয়সী পাঠকদের কাছে জাতকের কাহিনীগুলো অবশ্যই
সুখপাঠ্য।
শোনা যাক একটি জাতক কাহিনী
জাতকের বিভিন্ন কাহিনী
পুনর্জন্মের সূত্রে গ্রথিত, যে পুনর্জন্মের পরিসমাপ্তি ঘটেছে বুদ্ধদেবের
নির্বাণলাভের মাধ্যমে। পুনর্জন্ম কেন, তা ব্যাখ্যা করা যায় বুদ্ধদেবের
নিজের জীবন ও লক্ষ্য দিয়ে। জাতকের প্রতিটি কাহিনীতেই পাপ-পুণ্য,
ধর্ম-অধর্মের কথা বলা হয়েছে। সেই সারমেয় বা কুকুরের গল্পটা ধরা যাক। এই
গল্পটাও জাতকের আর পাঁচটা গল্পের মতোই নীতিকাহিনী।
কুকুরটি ছিল
গৃহহীন। পথেঘাটেই ছিল তার বাস। জাতকের এই কাহিনী থেকে জানা যায়, একবার
বুদ্ধদেবের এরকম জন্ম হয়েছিল। কিন্তু নেতৃত্ব দেওয়ার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য
ছিল কুকুরটির। এই চরিত্রগুণেই সে একদিন রাস্তার সব কুকুরদের নেতা হয়ে যায়।
কোনো একটি ঘটনার জন্য রাজার বিষনজর পড়েছিল রাস্তার কুকুরগুলোর ওপর। আর
তাদের বাঁচানোর দায়িত্ব কুকুরদের দলনেতা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল।
জাতকে বিভিন্ন গল্পের চরিত্র নিয়ে তৈরি হওয়া বইয়ের প্রচ্ছদ;
রাজার
রথের জন্য যে ঘোড়ার সাজ ব্যবহার করা হয়েছিল, তা রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে খোলা
আকাশের নিচে ফেলে রাখা হয়েছিল। রাতভর বৃষ্টিতে সাজ একেবারে ভিজে নষ্ট হয়ে
গিয়েছিল। সাজের চামড়ার অংশটুকু হয়ে গিয়েছিল নরম আর সুসিদ্ধ। এক ঝাঁক শিকারি
কুকুর ছিল রাজার। চামড়ার সাজ টুকরো-টুকরো করে সেই শিকারি কুকুরের দল
ভোজনপর্ব সেরেছিল।
খবর গেল রাজার কাছে। কিন্তু প্রাসাদের ভৃত্যরা
জানালো, রাস্তার কুকুরগুলো পয়ঃপ্রণালী দিয়ে প্রাঙ্গণে ঢুকে চামড়ার সাজ
খেয়েছে। রাজা খুব ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন, আদেশ দিলেন, শহরের সমস্ত কুকুরকে নিধন
করতে হবে। ভীতসন্ত্রস্ত ক্ষুদ্ধ কুকুরের দল ছুটে এলো সেই গৃহহীন কুকুরের
কাছে। সেই কুকুর তার বিক্ষুব্ধ অনুগামীদের শান্ত করলো এবং প্রাসাদের পথে
রওনা হলো।
সবসময় সত্যের ওপর ভরসা রাখার সহজ পথটি অনুসরণ করতো
কুকুরটি। আর সেই সত্যের জোরেই সে পৌঁছে গেল রাজার কাছে। পথে কোনো নিপীড়নের
শিকার হতে হলো না তাকে। রাজাকে বুঝিয়ে বললো সে। কুকুরটি রাজাকে তার নিজের
শিকারি কুকুরদের ঘাস আর ঘোল খাওয়ানোর পরামর্শ দিল। রাজা সেইমতো আদেশ দিলেন।
রাজার শিকারি কুকুরদের ঘাস আর ঘোল খাওয়ানোর সাথে-সাথে বমি করলো কুকুরের
দল। বেরিয়ে এলো চামড়ার সব টুকরো।
কুকুরটি প্রমাণ করলো, তার অনুগামীরা
একেবারেই নির্দোষ। ভবঘুরে কুকুরটির জ্ঞানবুদ্ধির পরিচয় পেয়ে রাজা তারই
খাবার থেকে কুকুরটিকে নিয়মিত ভাগ দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। কোনো প্রাণীকেই
কখনও হত্যা করা হবে না, কুকুরটির এই অনুরোধ রাজা মঞ্জুর করলেন। এই কাহিনীর
প্রধান চরিত্রটি যে স্বয়ং বুদ্ধদেব, তা আগেই বলা হয়েছে। আর রাজা হলেন তারই
প্রধান শিষ্য আনন্দ।
তথ্য সূত্র https://roar.media/bangla, ও https://bn.wikipedia.org
৪২ এর পর ৪৪ নং পোস্ট হোল... ৪৩ বান্দা বাহাদুর বাংলায় সম্ভবত প্রকাশিত হয়নি ।
আফগান বংশোদ্ভূত মুইজুদ্দিন মোহাম্মদ, যিনি মোহাম্মদ ঘোরি নামে পরিচিত ১১৯২
সনে তারাই এর যুদ্ধে দিল্লির শেষ স্বাধীন রাজপুত রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহানকে
পরাজিত ও হত্যা করে ভারতবর্ষে সুলতানি শাসনের সূচনা করেন। দিল্লি দখলের পর
তিনি তার বিশ্বস্ত তুর্কি বংশোদ্ভূত সেনাপতি কুতুবউদ্দিন আইবকের হাতে
ভারতের দায়িত্ব ন্যস্ত করে গজনী ফিরে যান; সূচনা হয় ভারতবর্ষের ইতিহাসে
সুলতানি শাসনের। মূলত এ সময়টা সুলতানের শাসন উত্তর পশ্চিম ভারতেই সীমাবদ্ধ
ছিল; দক্ষিণ ভারত এবং পূর্ব দিকে বাংলা তখনো ছিল অসংখ্য ছোট ছোট স্বাধীন
হিন্দু রাজ্যে বিভক্ত। রাজ্যগুলো আকারেও যেমন ছোট ছিলো, তেমন ছিলো সামরিক
শক্তিতে দুর্বল। মূলত ব্যবসা বাণিজ্য আর অভ্যন্তরীণ ঝামেলা সামলাতেই ব্যস্ত
ছিলো তারা।
দিল্লি দখলের পরে আফগান সুলতানদের লোলুপ দৃষ্টি এবার
এসে পড়লো দক্ষিণ এবং পূর্বের এই ছোট ছোট রাজ্যগুলোর উপর। কিন্তু মাঝখানে
দুর্লঙ্ঘ্য বাধা হয়ে দেখা দেয় রাজপুত শাসিত রাজস্থান। ইতিহাসে রাজপুতরা হার
না মানা দুর্ধর্ষ যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসে তারা কখনোই পরাভব স্বীকার
করে নেয়নি কারো। সাফল্যের সাথে মহাবীর আলেকজান্ডারকেও রুখে দিয়েছিলেন
তারা। তাদের বীরত্ব মুগ্ধ করেছিলো আলেকজান্ডার আর সেলুকাসকে। রাজপুতরা বীর
যোদ্ধার জাতি হলেও ছিল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিচ্ছিন্ন রাজ্যে বিভক্ত। তাই
উন্নততর যুদ্ধ কৌশলের অধিকারী বিশাল হানাদার বাহিনীর সাথে বীরের মত লড়লেও
বারে বারেই হার মানতে হয়েছে। হার মানলেও সুলতানি আমল থেকে মোঘল আমল কোন
সময়ই তাদের সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত করা যায়নি, হানাদারদের গলার কাঁটা হিসেবেই
তারা রয়ে গেছিল।
তৈমুর লং এর ছেলে শাহ রুখ মির্জা ১৪শ শতাব্দীতে এক
দিনেই প্রায় এক লক্ষ রাজপুতদের হত্যা করে। পরাজয় অত্যাসন্ন জেনে রাজপুত
নারীরা ইজ্জত বাঁচানোর জন্য আগুনে জীবন দিতে থাকে নিজেদের শরীরে আগুন
জ্বালিয়ে দিয়ে প্রচলন করেছিলো ‘জওহর’ বা ‘সতীদাহ’ আর! শুরু হয় ‘সতীদাহ’
প্রথা পুনঃপ্রচলন! এই রীতি পরে ছড়িয়ে পড়ে কুসংস্কার হিসেবে সারা ভারতে
ব্রাহ্মণ্যবাদীদের নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে। যার কোনো ভিত্তি হিন্দু
শাস্ত্রে নেই। (কিন্তু প্রাচীন ভারতীয় রীতিতে এটি প্রচলিত ছিলো বলে প্রমাণ
পাওয়া যায়। গুপ্ত সাম্রাজ্যের (খৃষ্টাব্দ ৪০০) আগে থেকেই ভারতবর্ষে সতীদাহ
প্রথার প্রচলন ছিল। প্রাচীন সতীদাহ প্রথার উদাহরণ পাওয়া যায় অন্তর্লিখিত
স্মারক পাথরগুলিতে। সব চেয়ে প্রাচীন স্মারক পাথর পাওয়া যায় মধ্য প্রদেশে,
কিন্তু সব থেকে বড় আকারের সংগ্রহ পাওয়া যায় রাজস্থানে। এই স্মারক
পাথরগুলিকে সতী স্মারক পাথর বলা হতো যেগুলো পূজা করার বস্তু ছিল
[Shakuntala Rao Shastri, Women in the Sacred Laws – The later law books
(1960)]। ডাইয়োডরাস সিকুলাস (Diodorus Siculus) নামক গ্রিক ঐতিহাসিকের
খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকের পাঞ্জাব বিষয়ক লেখায়ও সতীদাহ প্রথার বিবরণ পাওয়া
যায় [Doniger, Wendy (2009). The Hindus: An Alternative History. Penguin
Books. p. 611]। তাছাড়া, আলেকজান্ডারের সাথে ভারতে বেড়াতে আসা
ক্যাসান্ড্রিয়ার ইতিহাসবিদ এরিস্টোবুলুসও সতীদাহ প্রথার বর্ণনা লিপিবদ্ধ
করেন। খৃষ্ট পূর্বাব্দ ৩১৬ সালের দিকে একজন ভারতীয় সেনার মৃত্যুতে তার দুই
স্ত্রীই স্বপ্রণোদিত হয়ে সহমরণে যায় [Strabo 15.1.30, 62; Diodorus
Siculus 19.33; ‘Sati Was Started For Preserving Caste’ Dr. K.
Jamanadas]। (সূত্র: উইকিপিডিয়া)
তৈমুর লং ও শাহ রুখ মির্জার
কল্যাণে হিন্দু ধর্মের এই বর্বর প্রথাটি আবারো প্রচলিত হয়ে পড়ে। ১৮২৯ সালের
৪ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে সতীদাহ প্রথাকে
আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয়। এ সময় বেঙ্গলের গভর্নর ছিলেন লর্ড
উইলিয়াম বেন্টিংক। অবশ্য এ আইনি কার্যক্রম গৃহীত হয় মূলত প্রিন্স
দ্বারকানাথ (কবিগুরুর দাদু), ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আর রাজা রামমোহন রায়ের
সামাজিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতেই।)
১৩০৩ সালে দিল্লির মসনদ দখল
করেন তুর্কি বংশোদ্ভূত খিলজি বংশের দ্বিতীয় সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি; ১২৯০
সালে তিনি আপন চাচা এবং শ্বশুর সুলতান জালালুদ্দিন খিলজিকে হত্যা করে এবং
রাজন্যদের ঘুষ প্রদান করে হাত করে সিংহাসনে আসীন হন। দক্ষিণের গুজরাট এবং
মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের সীমানায় রাজস্থানের মেওয়ার রাজ্যের রাজা তখন রাজপুত
বংশের রাওয়াল রতন সিং। আর তাঁর রানী পদ্মাবতী ছিলেন অতুলনীয় সৌন্দর্যের
অধিকারিণী রূপে, গুণে অনন্যা এক রাজবধূ। তাঁর রূপ গুণের কাহিনী এতটাই
বিস্তৃত হয় যে, তা দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির কানেও পৌঁছে যায়।
ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত লম্পট, মদ্যপ আর ব্যভিচারী ছিলেন এই সুলতান। নিজের
সহস্র উপপত্নী থাকা স্বত্বেও মন ভরতো না তার। যেখানে কোন সুন্দরী রমণীর
সন্ধান পেতেন, ছলে বলে কলে কৌশলে তাকে অধিকার না করা পর্যন্ত শান্তি পেতেন
না তিনি। রানীর রূপের বর্ণনা শুনে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেননি তিনি।
বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন মেওয়ারের রাজধানী চিতোর অভিমুখে।
৭ম শতকে নি চিতোরগড়ের কেল্লা এক দুর্ভেদ্য দুর্গ, সেটা বাইরে থেকে
আক্রমণ করে ধ্বংস করা যে সহজ নয় বুঝতে পেরে সুলতান আশ্রয় নিলেন এক কৌশলের।
দূত মারফত রতন সিং এর কাছে খবর পাঠালেন। ‘তার দুর্গ দখল কিংবা রাজ্যহরণের
কোন মতলব নেই; তিনি কেবল রানী পদ্মিনীকে বোনের মত দেখেন, তাকে এক পলক দেখেই
চলে যাবেন। অকারণে নিজের সন্তানতূল্য প্রজাদের রক্তক্ষয় এড়াতে অনিচ্ছা
সত্ত্বেও রাজী হন রতন সিং। তবে রানী শর্ত দিলেন যে রানী সরাসরি সুলতানকে
দেখা দেবেন না, সুলতান আয়নায় তার প্রতিচ্ছবি দেখবেন।
কিন্তু সেই
আয়নার প্রতিচ্ছবি দেখেই আরও উন্মত্ত হয়ে পড়ে লম্পট আলাউদ্দিন খিলজি। আশ্রয়
নেয় এক নোংরা কৌশলের। কেল্লা থেকে অতিথিদের বিদায় দিতে রাজা রতন সিং সৌজন্য
বশত সুলতানের সাথে কিছু পথ এগিয়ে দিতে এলেন। সুলতান এটাকেই সুযোগ হিসেবে
গ্রহণ করে আচমকা রতন সিংকে বন্দি করে তার শিবিরে নিয়ে গেলেন। এরপর চিতোরগড়
কেল্লায় খবর পাঠালেন কাল সকালের মধ্যে রানী পদ্মিনীকে তার শিবিরে পাঠিয়ে
দিলে তিনি রাজা রতন সিংকে মুক্তি দেবেন এবং আর কারো কোন ক্ষতি না করে
দিল্লি ফেরত যাবেন। এই মহা সংকটে এগিয়ে এলেন রাজা রতন সিং এর দুই বীর
সেনাপতি চাচা-ভাতিজা বাদল এবং গোরা। তারা একটি পরিকল্পনা ফাঁদলেন, দূত
মারফত সুলতানের শিবিরে খবর পাঠালেন যে তারা সুলতানের প্রস্তাবে রাজী, রানী
পদ্মিনী পরদিন ভোরেই সুলতানের শিবিরে হাজির হবেন, কিন্তু রাজরানী বলে কথা,
তিনি একা যেতে পারেন না, তার সাথে থাকবে আর দেড়শ সখী।
পরদিন সকালে
কেল্লা থেকে রওনা হল পালকীর বহর। আসলে সেসব পালকির ভেতর রানী বা সখী কেউই
নেই; আছে সেনাপতি গোরা ও বাদলের নেতৃত্বে বাছা বাছা সবচেয়ে দুর্ধর্ষ দেড়শ
রাজপুত যোদ্ধা। শিবিরে পৌঁছেই তারা অপ্রস্তুত সুলতান বাহিনীকে চমক সামলে
ওঠার সময় দিলেন না, দ্রুততার সাথে সুলতানের দেহরক্ষীদের কচুকাটা করে
হতবিহবল রাজা রতং সিংকে দ্রুত মুক্ত করে সেনাপতি গোরা দ্রুত রাজা রতন সিংকে
একটি ঘোড়ায় চড়িয়ে কেল্লার দিকে রওনা করিয়ে দিলেন।
গোরা সুলতানের
শিবিরে ঢুকে সুলতানকে হত্যা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কাপুরুষ সুলতান সে
সময় তার রক্ষিতাকে সামনে বর্মের মত ঠেকে দেন। বীর রাজপুত গোরা তাঁর ধর্মীয়
নিয়মের কারণেই একজন মহিলাকে আঘাত করতে পারবেন না সেটা সুলতানও জানতেন। এই
অবস্থায় সুলতানের দেহরক্ষীদের হাতে গোরার প্রাণ যায়। বাদল নিরাপদেই রাজা
রতন সিংকে উদ্ধার করে কেল্লায় পৌঁছে গেলেন।
ক্রুদ্ধ আলাউদ্দিন এরপর
সর্বাত্মক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেল্লার ওপর। কিন্তু দুর্ভেদ্য কেল্লাটির
কিছুই করতে না পেরে কৌশল নেন চারপাশ থেকে অবরোধ করে রাখার। সুলতানের কৌশল
কাজ দেয় ভালোমতোই। কিছুদিনের মধ্যেই খাদ্যের অভাবে হাহাকার ওঠে চিতোরে। এই
অবস্থায় মহিলারা শত্রুর হাতে বেইজ্জত হবার চাইতে আত্মহনন করা শ্রেয় মনে করে
বেছে নেন জওহরের বা সতীদাহের পথ। দুর্গের ভেতর তৈরি এক বিশাল অগ্নিকুণ্ডে
রাজপরিবারের সব মহিলারা রানী পদ্মিনীর নেতৃত্বে তাদের বিয়ের পোশাক গয়না পরে
সেই অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপিয়ে আত্মাহুতি দিলেন। ‘সতী’ হয়েই নিলেন চিরবিদায়
স্বেচ্ছায়।
আর স্বজনহারা রাজপুত সৈনিকরা বেছে নিলেন ‘সাকা’ বা
‘সংশপ্তক’ প্রথা (যুদ্ধ করতে করতে জীবন দেয়া), রণসাজে সজ্জিত হয়ে তারা
দুর্গ থেকে বের হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন আকারে তাঁদের প্রায় ১০ গুণ বিশাল
সুলতানের বাহিনীর উপরে ‘হর হর মহাদেব’ শঙ্খনিনাদে। বীরের মতো জীবন দিলেন
রণক্ষেত্রে। সুলতান বাহিনী কেল্লার ভেতর প্রবেশের পর তখনো জ্বলন্ত
অগ্নিকুণ্ডে মহিলাদের পোড়া হাড়গোড় দেখতে পায়। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে কেল্লায়
আশ্রয় নেওয়া ৩০ হাজার রাজপুতকে হত্যা করেন সুলতান।