ডাউনলোড করুন
সকলের
সুধিন্দ্রনাথ
কোথায় খুলনার ‘নলদা’ গ্রাম !আজ কজন মানুষ তাঁর খবর রাখে ? হয়তো কিছু ছিন্নমূল
মানুষের কাছে গ্রামটি এখনো স্বর্গর মতো সুন্দর । হয়তো তাঁদের উত্তরসুরিরা বাবা
মায়ের কাছে নাম সুনেছে মাত্র, কিন্তু দেখা হয়ে ওঠেনি গ্রামটিকে, একদা সেই গ্রামটি
আদৌ আছে কিনা কেই বা খবর রাখে ?
কিন্তু সেই গ্রামেরই একটি অখ্যাত ছেলে এ পার বাংলায় আসে নাট্য জগৎ ও সাহিত্য
জগৎ এ যে বহু মুখি প্রতিভার পরিচয় রেখে গেছে বাংলার জগৎ ও সাহিত্য জগৎ এ তা অমর
হয়ে থাকবে ।
প্রিইমারি ইস্কুল থেকে হাই ইস্কুলে ভর্তি হিলাম, সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে মাঝে
মাঝে মনে হতো পুকুর থেকে সাগরে এসে পড়েছি, এর মধ্যেই কিছু স্মৃতি আজো অমলিন হয়ে
আছে। কৃষ্ণ বাবু বলে একজন শিক্ষক ছিলেন বিজ্ঞান পড়াতেন, মাঝে মাঝে আমাদের তিনি
গল্প বলে শোনাতেন, গল্প গুলো যেমন সুন্দর তেমন ছিল ওনার বচন ভঙ্গি, তন্ময় হয়ে আমরা
গল্প শুনতাম, গল্পের চরিত্র গুলো শুনে বুঝতাম একটাও নাম স্বদেশী নয় তাই একদিন
মাস্টার মসাই কে জিজ্ঞাসা করে বসলাম “স্যার এই গিল্প গুলো কার লেখা” ? শুনে উনি
বল্লেন শুকতারা পড়েছিস ? বললাম হ্যাঁ, শুকতারা পড়লেও লেখক কে ? কি তার পরিচয় , বা
তাদের নাম মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করতাম না গল্প পড়তে ভালো লাগতো তাই পড়তাম। স্যার
বল্লেন - দেখবি সুধিন্দ্র নাথ রাহা বলে একজন লেখক আছেন অনুবাদ গল্প লেখেন, সেই
প্রথম নামটা মনে গেঁথে গেল।
১৮৯৬ সালের ২৩ জানুয়ারী জদুনাথ রাহার ঘরে মৃন্ময়ীদেবীর কোলে যে অতিথি এলো তাঁর
নাম হোল ‘সুধিন্দ্র নাথ’, হাঁ যার নাম কম বেশী সকলের ই যানা, সাহিত্যিক
সুধিন্দ্রনাথ রাহা ।
সাহিত্যের অনুরাগটা অল্প বয়স থেকেই ছিল, মাত্র ১৭ বছর বয়সের চলে আসলেন এ পাড়ের
কুচবিহারে, তখন অবশ্য এ পাড় ও পাড় বলে কিছু ছিলনা সবটাই ছিল বাংলা। পড়া শুনা শুরু
করলেন ভিক্টোরিয়া কলেজ এ, এবং ইংরাজি ও সংস্কৃতে স্বর্ণ পদক নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে
পাস করলেন, কুচবিহারে রায়বাহাদুর প্রদান করেছিলেন সেই স্বর্ণ পদক, সঙ্গে প্রস্তাব
করে ছিলেন চাকরীর। সুধিন্দ্রনাথের মধ্যে জাতীয়তা বোধ ছিল প্রবল, সর্বজন সমুক্ষে
তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেবসলেন ।
কিন্তু ‘নাছোড়বান্দা’ রায়বাহাদুর এই রকম একটি হিরকখণ্ড হাতছাড়া করতে নারাজ, খোঁজ
খবর নিয়ে যানতে পারলেন কৌলীন্যে বংশ পরিচয়ে ছেলেটি কম যায় না, বাবা যদুনাথ ছিলেন
খুলনার ‘নলদা’ গ্রামের জমিদার, বাবা ছাড়া একমাত্র সহোদর দেসেই থাকে, তাই প্রস্তাব টা দিয়েই
বসলেন – সুধিন্দ্রনাথ কে জামাই করতে চান তিনি।
তিনি এবার তাঁর বাবার অনুমতির কথা বলেন , এবং তাঁর বাবার অনুমতি পাওয়ার পর ১৯
বছরের সুধিন্দ্র নাথের পরিণয় ঘটলো ৯ বছরের প্রিতিলতা দেবীর সঙ্গে।
মাত্র ২৬ বছর বয়সে প্রথম নাটক রচনা, সময়টা ১৯২২ সাল নাটক তখন বাঙালি জাতীর
একটি অঙ্গ, বাংলার রঙ্গমঞ্চে তখন যারা
অভিনয় করতেন এখন তাঁদের নাম শুনলে অভিনয় জগৎ এর ব্যক্তিত্ব থেকে নাট্য প্রিয় ব্যক্তি,সকল
কেই কপালে হাত ছোঁয়াতে হবে ! নাট্যাচার্য
শিশির ভাদুরি, ছবি বিশ্বাস থেকে সয়জুবালা,কাননবালা, কেনা অভিনয় করেছেন তাঁর লেখা
নাটকে ? তাঁর লেখা অনেক নাটকেই স্বয়ং কাজী নজরুল গান লিখে সুরারোপ করে ছিলেন।
তাঁর
লেখা প্রধান নাটক গুলির মধ্যে প্রথম নাটক মোগল মসনদ, রসোনাট্য সর্বহারা চলে ছিল
রঙমহলে, পৌরাণিক নাটক শিবাজ্জুন চলে ছিল মিনারভা থিয়েটারে, মেয়েদের জন্য লিখে
ছিলেন কাল্পনিক নাটক বীর্যশুক্লা অভিনীত হয়
মিনারভাতে,তা ছাড়া মহিলা দের জন্য মীরাবাঈ ও ভবানী মঠ ছিল বিখ্যাত নাটক,
ঐতিহাসিক নাটক মারাঠা মোগল অভিনীত হয় মিনারভাতে, রঙ্গনাট্য বিপ্লব চলেছিল মনোমোহন
থিয়েটারে।
আরো দুটি নাটক মনোমোহন থিয়েটারে অভিনীত হয় সমুদ্র গুপ্ত ও মহারাষ্ট্র ।
ছোটদের জন্য তাঁর লেখা নাটক ‘কেদার রাজা ও রানা প্রতাপ’।
ঐ সময়ে ভারতের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে জাতীয়তা বোধের প্রভাব ছিল, সুধিন্দ্রনাথ
তাঁর বাইরে ছিলেন বলে মনে হয় না , শোনা যায় তাঁর লেখা নাটক ‘বাংলার বোমা’ ইংরেজ সরকার
নিসিদ্ধ করে ছিল ! অজানা রয়ে গেছে সেই বোমার মসলা কি ছিল।
প্রথম দিকে যে নাট্যকার রুপে অর্থ উপার্জন করতে পারেন নি তাঁর প্রমান ১৯৩০
সালে তিনি চলে আসেন হুগলীর কোন্নগরে, কাজ নেন একটি ওষুধের দোকানে ! পারিবারিক ভাবে
ধনী হলেও কেন কাজ নিলেন ওষুধের দোকানে তা অজানা, যদিও এটিই তাঁর জীবনে প্রথম এবং
শেষ চাকরী।
সৃষ্টিশীল মানুষেরা কখনো বোসেথাকার লোক হয় না, সুধিন্দ্রনাথ ও ছিলেন না। কোন্নগরে দারহাটায় তৈরি করে ফেল্লেন একটি পাঠসালা,যেটি
কে পরে তিনি সেকেণ্ডারি ইস্কুলে পরিনত করেন। দারহাটায় গেলে এখনো তার আবক্ষ মূর্তির
দেখা মিলবে।
! আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে
একটা চল ছিল, বন্ধু বান্ধবদের জন্মদিনে সব্যসাচীর কলমে টারজানের
বইগুলি ছিল প্রথম পছন্দের তালিকায়।
সুধিন্দ্রনাথ ই সব্যসাচী ছদ্ম নামে লিখতেন।
শুকতারায় প্রথম দুটি টারজানের গল্প লিখেছিলেন নিপেন্দ্র কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়
১৩৫৯ বঙ্গাব্দে তৃতীয় কাহানী থেকে সুধিন্দ্রনাথ লেখা শুরু করেন। ১৩৭২ বঙ্গাব্দে
প্রথম লেখেন “টারজানের এডভেঞ্চার” ১৩৭৩ লেখেন “টারজানের নতুন
এডভেঞ্চার”,১৩৭৪ এ বের হয় “মৃত্যুহিন টারজান”, ১৩৭৫ এ বের হয় “বনের রাজা টারজান”, এর পর একের পর
এক গল্প বের হতে থাকে শুকতারায়। ওনার মৃত্যুর পর ও ১৩৯৯ সাল অবধি ধারাবাহিক ভাবে
টারজান প্রকাশিত হয়।
পরে দেবসাহিত্য কুটীরের টারজান সিরিজে ইংরাজি নামে গল্প গুলি বেরহতে থাকে।
যেমন টারজান দিএপ ম্যান, টারজান দি অ্যান্ড হিজ সন, টারজান দি ফিয়ারলেস্, টারজান
দি হিরো, টারজান ফাইট ফর হিজ লাইফ, টারজান অ্যান্ড হিজ ফ্রেন্ড ইত্যাদি বই গুলি
এখনো পাওয়া যায়। উনিই আবার শ্রী বেণীমাধব শীলের অক্ষয় লাইব্রেরী থেকে কলেজ
স্টুডেন্টদের জন্য ৫ টি টারজান সেরিজের বই লেখেন। এই সেরিজের বই গুলি লুপ্ত হতে
বসেছে ।
সুধিন্দ্রনাথের কলম এখানেই থেমে থাকেনি, করেছেন প্রায় ১০০০ উপর বিদাশী গল্পের
বঙ্গানুবাদ, দেব সাহিত্য কুটীরের অনুবাদ সেরিজের ‘এ টেল অফ টু সিটি’, লাস্ট ডেজ অফ
পম্পেই, ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট, ‘ট্রাডিজি অফ সেক্সপিওর’, ‘সেক্সপিওর কমিডি’ বিদাশি গল্প চয়ন, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ গল্প, গল্পের
বিশ্ব মেলা, ইত্যাদি উল্লেখ যোগ্য।
১৯৫০ সাল থেকে শুকতারায় প্রত্যেক সংখ্যায় থাকতো তার অনুবাদ একটি ছোট গল্প,
কখনো ভুতের গল্প কখনো বা দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের গল্প কখনো রুপকথার গল্পের
অনুবাদ,
অনুবাদ না বলে ভাবানুবাদ বলা যেতে পারে, কারন বড়দের জন্য লেখা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ
গল্প গুলি সাবলিন ভাবে ছোটদের জন্য উপযোগী করে লেখেন,এ গুলিকে শুধু অনুবাদ না বলে
ভাবানুবাদ বলা চলে । এই গল্প গুলি না পড়তে
পারলে ভাত রুচতোনা আমাদের ।
এই সব লেখা গুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হলদে হয়ে যাওয়া শুকতারার পাতায়, এখনো দেখা
মেলে মাঝে মাঝে । তাঁর লেখা শেষ ছোট গল্প শুকতারায় বের হয় ‘প্রলয়ের প্রক্কালে
হোমস্’( শারলক্ হমস্এর একটি গল্প )।
শ্রী বৈজ্ঞানিক নামে কল্প বিজ্ঞানের অনেক গল্প শুকতারায় অনুদিত হয়। ‘লতার নাম হাউ মাউ
খাউ”, “আলফা সেন্টুরির পথে’ উল্লেখ যোগ্য।
( অনেকে বলেন তিনি মধুসুদন মজুমদার ছদ্ম নামে ‘অমর বীর কাহানী’ ধারাবাহিক
শুকতারায় লেখেন, আসল মধুসুদন মজুমদার ছিলেন জন্মান্ধ তিনি দৃষ্টিহীন ছদ্ম নামে
লিখতেন )
মৌলিক সাহিত্যে ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ,
গোয়েন্দা গল্প লিখেছেন অনেক, বই আকারে প্রকাশ পায়
গোয়েন্দা গল্প শেষ বলী, নৈশ অভিযান, ইস্কাবনের টেক্কা,লক্ষ টাকার
হীরে,মুখোসের অন্তরালে, ব্লাড হাউণ্ড,কালেরে কবলে ইত্যাদি।
লিখেছেন শুকতারায় ধারাবাহিক ভাবে গল্প সমকালিন কঠিন বাস্তবতা পূর্ব বঙ্গ থেকে
উৎখাতিত মানুষের দুঃখ যন্ত্রণার কাহানী “তাসের প্রাসাদ”, পরে বই আকারে
প্রকাশ পায় ‘মা ভাই বোন’ নামে।
বাংলা সাহিত্তে এ রকম অজস্র মনি মুক্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখে গেছেন মানুষটা। ছড়িয়ে
ছিটিয়ে এই কারনে বলছি সেই সময় তাঁর অনেক লেখাই প্রকাশ পেয়ে ছিল ছদ্ম নামে ।
যা কিনা এখন ইতিহাসের অতলে লুকিয়ে আছে , এই বিষয় ও গবেষণা করা যেতে পারে।
শেষ জীবনে তিনি তাঁর একমাত্র ভাই নাট্যকার দেবেন্দ্রনাথ রাহার কাছে কালনায়
গিয়ে থাকতেন, ও মৃত্যুর কিছুদিন আগে উল্টোডাঙ্গার বাসভবনে চলে এসে ছিলেন পুত্র ‘অম্বরিশ রাহার’ কাছে, ১৮
ফেব্রুয়ারী ১৯৮৬ সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
পরিতাপ ও লজ্জার বিষয় মৃত্যুর মাত্র ৩ মাস আগে তিনি ‘কালিদাস রায়’ পুরস্কার পান।
বেসিমাত্রায় আত্ম সমালোচক অথচ আত্ম বিস্থিত বাঙালীর কাছে এটাই সান্তনা।