Saturday, September 26, 2020

Post # 1004 Bengali Amarchitra Katha 086

                                                    ডাউনলোড করুন

 

 

 ৮০ -৮৬ বাংলায় প্রকাশিত হয়নি সম্ভবত...







পৃথিবীর যেকোন দেশে স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী ভাবধারা বিকাশের সঙ্গে সেই দেশের দেশাত্মবোধক ও জাতীয়তাবাদী সাহিত্যের সম্পর্ক অতি ঘনিষ্ঠ। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে দেশাত্মবোধক সাহিত্যের বিকাশ ভারত ইতিহাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যে সমস্ত মনীষীরা তাদের লেখার মাধ্যমে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবোধের উন্মেষ ও প্রসার ঘটিয়েছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায এবং তার লেখা দেশাত্মবোধক উপন্যাস আনন্দমঠ'   

          আনন্দমঠ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর।

আনন্দমঠ উপন্যাসের পটভূমি : আনন্দমঠ উপন্যাসের পটভূমি হল অষ্টাদশ শতকের সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ ও ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। আনন্দমঠে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের মর্মস্পর্শী বর্ণনা আছে। এই উপন্যাসের মূল সুর হল দেশাত্মবোধ এবং পরাধীন মাতৃভূমিকে মুক্ত করার জন্য সন্তানদের প্রবল প্রচেষ্টা।
সন্তান দল: বাংলায় মুসলিম রাজশক্তির পতন ও ইংরেজ রাজত্বের প্রতিষ্ঠা এক নৈরাজ্যের সৃষ্টি করে। এই সংকটকালে ইংরেজ শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশমাতার মুক্তির জন্য সন্তান দলের আবির্ভাব ঘটে। আনন্দমঠউপন্যাসের মূল চরিত্রই সন্তান দল। তাদের আদর্শ অনুসরণ করে দেশের যুবসমাজকে দেশমাতার পরাধীনতার শৃঙ্খলমোচনের জন্য এগিয়ে আসার আহ্বান জানান বঙ্কিমচন্দ্র।

                    আনন্দমঠ উপন্যাসে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য একদল আত্মত্যাগী সন্ন্যাসীর কার্যাবলির বিবরণ আছে। এই উপন্যাসে সত্যানন্দের আহ্বানের মধ্যে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের জাতীয়তাবোধ জাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আনন্দমঠ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র পরাধীন দেশমাতার লাঞ্ছিত রূপ তুলে ধরেছেন। তিনি এই দেশমাতার উদ্ধারের জন্য আত্মবলিদানে প্রস্তুত একদল মাতৃভক্ত সন্তানের কথা বলে যুবসম্প্রদায়কে দেশপ্রেম ও সংগ্রামী জাতীয়তাবাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন। আনন্দমঠের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে ভারতের চরমপন্থী ও বিপ্লবীরা দেশকে মাতৃরূপে কল্পনা করে তাকে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত করার কাজে ব্রতী হন।

    বন্দেমাতরম গান ও স্লোগানটি আনন্দমঠ উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত। ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদের প্রসারে বন্দেমাতরম-এর অবদান অপরিসীম। ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বন্দেমাতরম গানটি গেয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিলেন।

  ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবোধের বিকাশে ঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ ও তাঁর বন্দেমাতরম গানটির অবদান অপরিসীম। অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ দত্ত আনন্দমঠের স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্রকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রকৃত জনক বলে অভিহিত করেছেন 

     তথ্য সূত্র   http://history4u3.blogspot.com/       





 

Friday, September 25, 2020

Post # 1003 English Amarchitra Katha 079

                                                                         ডাউনলোড করুন 

 

 

 

 ৭৮ নং শ্রীদত্তের দেখা বাংলায় পাওয়া যায়নি, ৭৯ পোস্ট করলাম । 


 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

কিছু বই বাংলায় প্রকাশিত হলেও আমি পাইনি... কিন্তু যে গুলি সংগ্রহে রাখার মতো... যেমন জাতক,পঞ্চতন্ত্র, 'কথা সরিৎ সাগর',হিতোপদেশ ইত্যাদি , সেগুলি ইংরাজি তে পেয়ে রেখে দিয়েছি... সেগুলি পোস্ট করবার ইচ্ছা ছিল... সে রকম একটি বই আজ পোস্ট করলাম... সহজ ভাষায় লেখা ,আশাকরি ছোটোদের পড়তে অসুবিধা হবে না ।  

জাতক  গৌতম বুদ্ধের অতীত জীবনের কাহিনীমূলক গল্পসাহিত্য। এটি ত্রিপিটকের অন্তর্গত এবং এর কথক  গৌতম বুদ্ধ স্বয়ং। বুদ্ধত্ব লাভের পর সিদ্ধার্থ গৌতম তাঁর অতীত জীবনের কথা স্মরণ করার ক্ষমতা অর্জন করেন। তখন তিনি শিষ্যদের সঙ্গে ধর্মালোচনাকালে প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হিসেবে তাঁর অতীত জীবনের বহু ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। সেসব ঘটনার সংকলনই জাতক সাহিত্য।

খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকে বুদ্ধঘোষ রচিত 'জাতকত্থবণ্ণনা'  নামক গ্রন্থে ৫৪৭টি জাতক অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর তেরো বছর পর আঠারো শতকে অধ্যাপক ফৌজবল লন্ডন পালি বুক সোসাইটির উদ্যোগে ইংরেজি অনুবাদসহ ছয় খন্ডে যে জাতকগ্রন্থ প্রকাশ করেন তাতেও জাতকের সংখ্যা ছিল পূর্ববৎ। কিন্তু ত্রিপিটকের সূত্তপিটক মতে বুদ্ধদেব ৫৫০ বার জন্ম পরিগ্রহ করেন। সে অনুযায়ী জাতকের সংখ্যা হওয়া উচিত ৫৫০টি।

জাতকের এই গল্পগুলি দীর্ঘকাল গুরুশিষ্য পরম্পরায় শ্রুতি থেকে স্মৃতিতে সংরক্ষিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সম্রাট অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত তৃতীয় বৌদ্ধমহাসঙ্গীতি (বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সম্মেলন) কালে জাতক গ্রন্থিত হয়। তখন পালি ভাষাতেই জাতকের গল্পগুলি লিখিত হয়েছিল; পরবর্তীকালে বাংলাসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় তা অনূদিত হয়। বাংলায় জাতক অনুবাদ করেন ঈশাণচন্দ্র ঘোষ। তিনি ষোলো বছরে ছয় খন্ডে জাতকের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন।

প্রত্যেকটি জাতকের তিনটি অংশ থাকে: প্রত্যুৎপন্নবস্ত্ত, অতীতবস্ত্ত ও সমাধান। প্রত্যুৎপন্নবস্ত্ত হচ্ছে জাতকের উপক্রমণিকা অংশ। এখানে জাতকের উপলক্ষ ও প্রাসঙ্গিকতা বর্ণিত হয়; অর্থাৎ বুদ্ধ কখন, কোথায়, কাকে উপলক্ষ করে এবং কোন প্রসঙ্গে এই জাতক কাহিনী বিবৃত করেছিলেন তার বিবরণ থাকে এ অংশে। অতীতবস্ত্ত হচ্ছে জাতকের মূল অংশ, অর্থাৎ এখানে বুদ্ধের পূর্বজন্মের কাহিনীগুলি বর্ণিত হয়। আর শেষ অংশ সমাধানে প্রত্যুৎপন্নবস্ত্তর সঙ্গে অতীতবস্ত্তর চরিত্রগুলির অভিন্নতা বা যোগসূত্র স্থাপন করা হয়। অর্থাৎ জাতকে বর্ণিত চরিত্রগুলির কে কোন জন্মে কি ছিলেন সে পরিচয় এখানে তুলে ধরা হয়।

জাতকের সব কথাই উপদেশমূলক। এর বাণী কোনো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলি সর্বজনীন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই জাতক থেকে মানবিক উপদেশাবলি গ্রহণ করতে পারে। এছাড়া জাতকে পুরাকালের আচার-অনুষ্ঠান, রীতি-নীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, শিক্ষা-দীক্ষা, বিচার-আচার ইত্যাদির বিবরণ পাওয়া যায়। জাতকের রচনাকৌশলও অত্যন্ত হূদয়গ্রাহী। বাংলা সাহিত্যসহ বিশ্বের বহু সাহিত্য জাতকের নির্যাস গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হয়েছে।

তথ্য সূত্র    http://bn.banglapedia.org






 

Wednesday, September 23, 2020

Post # 1002 Bengali Amarchitra Katha 077

                                                                        ডাউনলো ড করুন

 

 

 

৭৬ নং সুন্দরী, বাংলায় প্রকাশিত হয়েছিল কি না সন্ধেহ আছে...বাংলায় প্রচুর বই ই প্রকাশিত নয় ।

 

 নেতাজির মৃত্যু রহস্যই থেকে গেছে... তবে  bbc র বাংলা সাইট থেকে ওঁদের বক্তব্য তুলে ধরলাম ।  ...

তবে এই প্রতিবেদন সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহ আছে । ...এটাও জানা যায় যে নেতাজি সোভিয়েত দেশ এ গৃহ বন্দী অবস্থায় মারা গেছেন।

 https://www.bbc.com/bengali/news-46973443

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এক কিংবদন্তি নেতা সুভাষচন্দ্র বসু। সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে ভারতকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিভাবে তার মৃত্যু হয়েছে সেটা এখনও পরিস্কার নয়। ২৩শে জানুয়ারি তার জন্মবার্ষিকীতে বিবিসির হিন্দি বিভাগ জানতে চেষ্টা করেছে কী হয়েছিল মি. বসুর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোতে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর পূর্ব রণাঙ্গনে জাপানি সেনাবাহিনীর মনোবল একেবারে তলানিতে ঠেকেছিল। সেই সময়েই সুভাষচন্দ্র বসু সিঙ্গাপুর থেকে ব্যাংকক হয়ে সাইগনে পৌঁছেছিলেন।

কিন্তু সেখান থেকে এগোনোর জন্য একটাও জাপানি বিমান ছিল না। অনেক চেষ্টার পরে একটা জাপানি বোমারু বিমানে জায়গা পেয়েছিলেন তিনি।

বিমানঘাঁটিতে তাকে বিদায় জানাতে এসেছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের যেসব সহকর্মী, তাদের সঙ্গে করমর্দন করে 'জয় হিন্দ' বলে অভিবাদন জানিয়ে কিছুটা লাফিয়েই বিমানের সিঁড়িগুলো বেয়ে উপরে উঠে গিয়েছিলেন তিনি।

তিনি বিমানে ওঠার পরেই অন্যদের 'জয়-হিন্দ' অভিবাদন জানিয়ে তার এডিসি কর্নেল হাবিবুর রহমানও বিমানে উঠে গিয়েছিলেন।

মি. বসুর ওপরে 'লেইড টু রেস্ট' নামের বইটির লেখক, সিনিয়র সাংবাদিক আশিস রায় বলছিলেন, "ওই বিমানটিতে ক্রুসহ ১৪ জন ছিলেন। পাইলটের ঠিক পিছনেই নেতাজী বসেছিলেন। তার সামনে পেট্রোলের বড় বড় জেরিক্যান রাখা ছিল। নেতাজীর পিছনেই ছিলেন কর্নেল হাবিবুর।"

"বিমানে চড়ার সঙ্গে সঙ্গেই জাপানিরা নেতাজীকে সহ-পাইলটের আসনে বসার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সেই অনুরোধ তিনি বিনম্রভাবে ফিরিয়ে দেন। ঘটনা হল, সহ-পাইলটের আসনটি তার মতো লম্বা মানুষের জন্যে বেশ ছোট ছিল," বলছিলেন মি. রায়।

তার কথায়, "পাইলট আর লেফটেন্যান্ট জেনারেল শীদে ছাড়া বাকি সকলেই বিমানের মেঝেতেই বসেছিলেন। নেতাজীকে একটা ছোট কুশন দেওয়া হয়েছিল। কারও কাছেই সীট বেল্ট ছিল না।"

ওই বোমারু বিমানের ভেতরে ভীষণ ঠাণ্ডা লাগছিল সবার। তখনকার দিনে যুদ্ধবিমানে এয়ার কন্ডিশনার লাগানো থাকত না। প্রত্যেক হাজার মিটার ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই বিমানের তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি করে কমে যেত।

ঠাণ্ডা আটকাতে সুভাষচন্দ্র বসু তার এডিসি কর্নেল হাবিবুর রহমানের কাছ থেকে তার জ্যাকেটটা চেয়ে নিয়েছিলেন। দুপুর দুটো ৩৫ মিনিটে বোমারু বিমানটি জমি ছেড়ে আকাশে উড়েছিল।

কর্নেল হাবিবুর রহমান, বাম দিক থেকে দাঁড়িয়ে, প্রথম

কর্নেল হাবিবুর রহমান, বাম দিক থেকে দাঁড়িয়ে, প্রথম

 

শাহনওয়াজ কমিশনে (বিমান দুর্ঘটনায় মি. বসুর মৃত্যু হয়েছিল কিনা সেটা খতিয়ে দেখতে ভারতের গঠিত প্রথম সরকারি কমিটি) দেওয়া সাক্ষ্যে কর্নেল হাবিবুর রহমান বলেছিলেন, "বিমান তখনও বেশি উপরে ওঠে নি। বিমানঘাঁটির চৌহদ্দির মধ্যেই ছিল। সেই সময়েই বিমানের সামনের দিকে একটা বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাই। পরে জেনেছিলাম বিমানের একটা প্রোপেলার ভেঙ্গে নীচে পড়ে গেছে। বিমানটা নীচে পড়ে যেতেই সামনের দিকে আর পেছনের দিকে আগুন লেগে গিয়েছিল।"

"বিমান ভেঙ্গে পড়তেই নেতাজী আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। আমি তাকে বলেছিলাম, সামনের দিক দিয়ে বের হওয়ার জন্য। পেছনের দিকে যাওয়ার জায়গা নেই। সামনের দিকেও আগুন জ্বলছিল। তার মধ্যে দিয়েই তিনি বাইরে বেরিয়ে যান। কিন্তু তিনি যেখানে বসেছিলেন, তার সামনে রাখা পেট্রল ভর্তি জেরিক্যান থেকে তেল বেরিয়ে তার কোট পুরো ভিজে গিয়েছিল," শাহনওয়াজ কমিশনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে জানিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্রের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কর্নেল হাবিবুর রহমান।

তিনি আরও বলেছিলেন, "আমি বাইরে এসেই দেখি নেতাজী ১০ মিটার দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। পশ্চিমের দিকে তাকিয়েছিলেন তিনি। ততক্ষণে তার পোশাকে আগুন লেগে গেছে। আমি তার দিকে দৌড়ে গিয়ে অনেক চেষ্টার পরে তার 'বুশর্ট বেল্ট'টা খুলতে পারলাম। তারপরে তাকে মাটিতে শুইয়ে দিই আমি। তার মাথার বাঁদিকে প্রায় ৪ ইঞ্চি লম্বা একটা গভীর ক্ষত।"

"একটা রুমাল দিয়ে ওই ক্ষত থেকে রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করছিলাম। তখনই নেতাজী আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, 'তোমার বেশি চোট লাগে নি তো?' বলেছিলাম যে আমি ঠিক আছি," জানিয়েছিলেন কর্নেল রহমান।

"উনি বলেছিলেন মনে হচ্ছে আমি আর বাঁচব না। আমি ভরসা দিয়েছিলাম, 'আল্লাহ আপনাকে বাঁচাবে'। তিনি বলেছিলেন, 'আমার মনে হচ্ছে না। দেশে ফিরে গিয়ে সবাইকে জানিও যে আমি শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলাম। তারা যেন এই লড়াই জারি রাখে। ভারত নিশ্চয়ই স্বাধীন হবে," এভাবেই সেই ঘটনার বিবরণ দিয়েছিলেন তিনি।

দশ মিনিটের মধ্যেই উদ্ধারকারী দল বিমানঘাঁটিতে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু তাদের সঙ্গে কোনও অ্যাম্বুলেন্স ছিল না। তাই সুভাষচন্দ্র আর বাকি আহতদের সেনাবাহিনীর একটা ট্রাকে করেই তাইহোকু সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মি. বসুকে প্রথম যে চিকিৎসক পরীক্ষা করেছিলেন, তার নাম ছিল ডাক্তার তানইয়াশি ইয়োশিমি।

১৯৪৩ সালে সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ ফৌজের স্যালুট নিচ্ছেন মি. বসু

১৯৪৩ সালে সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ ফৌজের স্যালুট নিচ্ছেন মি. বসু

১৯৪৬ সালে হংকং এর এক কারাগারে ব্রিটিশ কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন অ্যালফ্রেড টার্নারের জেরার জবাবে ডাক্তার ইয়োশিমি বলেছিলেন, "গোড়ায় সব আহতদের একটা বড় ঘরে রাখা হয়েছিল। কিন্তু পরে মি. বোস আর মি. রহমানকে একটা অন্য ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। দুর্ঘটনায় আহত অন্য জাপানি সৈনিকরা ব্যথায় চিৎকার করছিল তখন। তাই ওদের দু'জনকে আলাদা ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়।"

ডাক্তার ইয়োশিমি জানিয়েছিলেন, "মি. বসুর ভীষণ জলপিপাসা পেয়েছিল। তিনি জাপানি ভাষাতেই জল চাইছিলেন বার বার - মিজু, মিজু করে। সেখানে যে নার্স ছিলেন, আমি তাঁকে বলি একটু জল দিতে।"

সুভাষচন্দ্রের আঘাতের বর্ণনা করতে গিয়ে ডাক্তার ইয়োশিমি বলেছিলেন, "তিনটের সময়ে এক ভারী চেহারার মানুষকে সেনাবাহিনীর ট্রাক থেকে নামিয়ে স্ট্রেচারে করে নিয়ে আসা হয়। তার মাথা, বুক, পিঠ, হাত, পা, এমনকি তার হৃদযন্ত্রও - সব সাংঘাতিকভাবে পুড়ে গিয়েছিল।"

ডাক্তার ইয়োশিমির বর্ণনায়, "তার চোখগুলো ফুলে গিয়েছিল। তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন, কিন্তু চোখ খুলতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। জ্বর ছিল গায়ে, ১০২.২ ডিগ্রি। পালস রেট হয়ে গিয়েছিল প্রতি মিনিটে ১২০। তাকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার জন্য বিটা-ক্যাম্ফোর-এর চারটে আর দুটো ডিজিটামাইন ইনজেকশন দিয়েছিলাম। তারপরে ড্রিপ চালু করি। এছাড়া সংক্রমণ যাতে না ছড়ায়, তার জন্য সালফানামাইড ইনজেকশনও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমি বুঝতেই পারছিলাম, এত কিছুর পরেও বোস আর বেশিক্ষণ জীবিত থাকবেন না।"

হাসপাতালেই হাজির ছিলেন আরেক চিকিৎসক ডাক্তার ইয়োশিও ইশি। তিনিও সুভাষ বসুর অবস্থার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছিলেন।

" আহত দু'জন দুটো আলাদা খাটে শুয়ে ছিলেন। একজন এতটাই লম্বা ছিলেন যে তার পা খাটের বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল। একজন নার্স আমাকে ডেকে বলেছিলেন, 'ডক্টর, ইনিই ভারতের চন্দ্র বোস। রক্ত দিতে হবে উনাকে। আমি শিরা খুঁজে পাচ্ছি না, প্লিজ একটু সাহায্য করুন আমাকে'," জানিয়েছিলেন ডাক্তার ইশি।

এই ছবিটি ব্যাংককে তোলা, ১৯৪৫ সালে। ছবির নিচে মি. বসুর স্বাক্ষর দেখা যাচ্ছে।


তার কথায়, "আমি যখন রক্ত দেওয়ার জন্য তার শিরায় সুচ ফোটালাম, কিছুটা রক্ত সুচ দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। রক্তের রঙটা ছিল গাঢ়। মৃত্যুর কিছুটা আগে থেকেই রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে থাকে আর রক্তের রঙ পাল্টাতে থাকে।"

"একটা বিষয় আমাকে বেশ অবাক করেছিল। পাশের ঘরে দুর্ঘটনায় আহত জাপানি সৈনিকরা ব্যথায় চিৎকার করছিল, কিন্তু সুভাষচন্দ্র বসুর মুখ থেকে একটা শব্দও বের হয়নি। অথচ আমি ডাক্তার হিসাবে বুঝতে পারছিলাম তার কতটা শারীরিক কষ্ট হচ্ছে," জানিয়েছিলেন ডাক্তার ইশি।

১৮ অগাস্ট, ১৯৪৫, রাত প্রায় ন'টার সময়ে সুভাষ চন্দ্র বসু শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

আশিস রায়ের কথায়, "জাপানে মৃতদের ছবি তোলার প্রথা নেই। কিন্তু কর্নেল রহমান বলেছিলেন যে তিনি জেনে-শুনেই সুভাষচন্দ্রের ছবি তুলতে দেন নি। কারণ তার শরীর তখন বেশ ফুলে গিয়েছিল।"

"জাপানি সেনাবাহিনীর মেজর নাগাতোমোর কথা অনুযায়ী, তার গোটা শরীরেই ব্যান্ডেজ বাঁধা ছিল। ওর পার্থিব শরীরটা ঘরের এক কোনে রেখে দেওয়া হয়েছিল। চারদিকে একটা পর্দা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সামনে কয়েকটা মোমবাতি জ্বলছিল। ফুলও ছিল কিছু," বলছিলেন মি. রায়।

"কয়েকজন জাপানি সৈনিক সেখানে হাজির ছিলেন। সম্ভবত সেইদিনই, অথবা পরের দিন, ১৯ অগাস্ট নেতাজীর শরীর একটা কফিনে রাখা হয়। মেজর নাগাতোমো কফিনের ঢাকনা খুলে নেতাজীর চেহারা একবার দেখেছিলেন।"

কোনও বিমান না পাওয়ার ফলে তার মৃতদেহ সিঙ্গাপুর বা টোকিওতে নিয়ে যাওয়া যায় নি। চারদিন পরে, ২২ অগাস্ট তাইপেতেই তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। সেখানে হাজির ছিলেন কর্নেল হাবিবুর রহমান, মেজর নাগাতোমো আর সুভাষ চন্দ্রের দোভাষী জুইচি নাকামুরা।

মেজর নাগাতোমো শাহনাওয়াজ কমিশনে বলেছিলেন, আমি ফার্নেসের ঢাকনাটা খুলে ভেতর থেকে 'স্লাইডিং প্লেট'টা টেনে এনেছিলাম। ভেতরে নেতাজীর কঙ্কালটা পড়ে ছিল। শরীরটা দাহ করা হয়ে গিয়েছিল। একটা ছোট কাঠের কৌটা ছিল আমার সঙ্গে। বৌদ্ধ পরম্পরা অনুযায়ী দুটো চপস্টিক দিয়ে নেতাজীর ঘাড়ের কাছ থেকে একটা হাড় তুলে এনেছিলাম। তারপর একে একে তার শরীরের প্রত্যেকটা অঙ্গ থেকে একেকটা হাড় সংগ্রহ করে ওই কাঠের কৌটোর ভেতরে রেখেছিলাম।"

কর্নেল হাবিবুর রহমানও পরে জানিয়েছিলেন যে শ্মশানে এক কর্মকর্তা তাকে সুভাষ বসুর সোনায় বাঁধানো একটা দাঁত দিয়েছিলেন। ওই দাঁতটা মৃতদেহর সঙ্গে জ্বলে যায় নি।

আশিস রায়ের কথায়, "আমি যখন ১৯৯০ সালে পাকিস্তানে গিয়েছিলাম, তখন হাবিবুর রহমানের ছেলে নইমুর রহমানের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন যে তার বাবা কাগজে মোড়া সুভাষ বসুর ওই সোনা বাঁধানো দাঁতটা অস্থি- কলসেই রেখে দিয়েছিলেন।"

২০০২ সালে ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের দুই অফিসার যখন রেনকোজি মন্দিরে রাখা সুভাষ বসুর অস্থি-কলস পরীক্ষা করতে গিয়েছিলেন, তারাও ভেতরে ওই কাগজের মোড়কে রাখা সোনার দাঁতটা দেখতে পেয়েছিলেন।

সেই সময়ে জাপানে ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন আফতার শেঠ। তিনি বলছেন, "ওই দুজন অফিসার, সি রাজশেখর এবং আর্মস্ট্রং চেঙসন আমার সঙ্গেই টোকিওতে ভারতীয় দূতাবাসে কাজ করতেন। বাজপেয়ী সরকার যখন নেতাজীর মৃত্যুর তদন্ত করতে মুখার্জী কমিশন তৈরি করেন, তখন বিচারপতি মুখার্জীও টোকিওতে এসেছিলেন।"

আশিস রায় জানাচ্ছেন, "কিন্তু বিচারপতি মুখার্জী নিজে রেনকোজি মন্দিরে যান নি। তার নির্দেশ মতো দু'জন অফিসারকে পাঠানো হয়। তারা কাগজের মোড়কে রাখা ওই দাঁতের ছবিও তুলে এনেছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মুখার্জী কমিশন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে নেতাজীর মৃত্যু ওই বিমান দুর্ঘটনায় হয় নি আর রেনকোজি মন্দিরে যে অস্থি রাখা আছে, সেটাও নেতাজীর নয়।"

সুভাষচন্দ্র বসু।

"এটা অন্য বিষয় যে মনমোহন সিং সরকার মুখার্জী কমিশনের রিপোর্ট খারিজ করে দিয়েছে," বলছিলেন আশিস রায়।

সুভাষচন্দ্রের কন্যা অনিতা পাফেরও ইচ্ছা যে তার পিতার অস্থি ভারতে ফিরিয়ে আনা হোক।

মি. রায়ের কথায়, "অনিতাই আমার বইয়ের মুখবন্ধ লিখে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন যে নেতাজী একটা স্বাধীন ভারতে ফিরে এসে কাজ করতে চেয়েছিলেন। সেটা যখন সম্ভব হয় নি, তখন অন্তত তার অস্থিটা ভারতের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হোক। তার মৃত্যুর ৭৩ বছর পরে হলেও অস্থিটা যদি ভারতে নিয়ে এসে গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হয়, সেটাই বোধ হয় রাষ্ট্রের তরফে তার প্রতি সবচেয়ে বড় সম্মান জানানো হবে।"







 

Monday, September 21, 2020

Post # 1001 Bengali Amarchitra Katha 055

                                                                     ডাউনলোড করুন                           

 

 

 

 বইটি স্ক্যান করে পাঠিয়েছেন শ্রী শুভ্রজ্যোতি শীল... শুধু এটি নয় ...'সমুদ্র পথে ভারত' বই টি ও উনি পাঠিয়েছেন...তবে পরের বই টি ক্রম অনুসারে আসতে  বিলম্ব হবে । 

৫৫ নং সংখ্যা টি টপকে যেতে হয়ে ছিল তাই এবার পোস্ট করে দিলাম, প্রচ্ছদ ছিল না তাই ইংরাজি বইয়ের একটি প্রচ্ছদ করে দিলাম । 

Kovid 19  + থাকায় কিছুদিন বিশ্রাম এ ছিলাম... যদিও স্বাদ ও গন্ধ ৭ - ৮ দিনের জন্য না চলে গেলে কিছুই বুঝতে পারতাম না। 'করোনা' নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই... রোজ মাল্টি ভিটামিন খাওয়া ও রোদে ঘুরে বেড়ান , বৃষ্টি তে ভেজা সব ই করে বেড়াতাম, প্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক থাকলে কোন প্রবলেম হবার কথা নয়...স্থানীয় স্বাস্থ কেন্দ্রে বিনা মুল্যে এখন পরীক্ষাও হচ্ছে, আমার পাড়ার দুজন কাকু ৭০ ঊর্ধ্ব  বয়স... তাঁদের জ্বর কমছিলনা না বলে হাসপাতালে ছিলেন ... এখন সুস্থ হয়ে বাড়ি চলে এসেছেন... 'কভিড' তার শক্তি হারাচ্ছে... সবাই সুস্থ থাকুন ...।


  






 


Sunday, September 6, 2020

Post # 1000 Bengali Amarchitra Katha Special Issue 015

                                                                        ডাউনলোড করুন 
 

 

আজ ১০০০ নং পোস্টে থেকছে ১০০ পাতার একটি বিশেষ সংখ্যা ... পোস্ট কটি হোল সেটি আমার কাছে বড় কথা নয়... আমার কাজ আমি যতদিন পারবো করে যাবো।  

এই বিশেষ সংখ্যায় থাকছে শ্রীশ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণের জীবনী ও লোক শিক্ষার জন্য তাঁর বলা অসংখ্য ছোট গল্প..................।

শ্রীশ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ,  (১৮৩৬-১৮৮৬)  হিন্দু সংস্কারক ও আধ্যাত্মিক মানবতাবাদী। ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার কামারপুকুর গ্রামে এক মধ্যবিত্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় এবং মাতা চন্দ্রমণিদেবী দেবতা বিষ্ণুর অপর নামানুসারে পুত্রের নাম রাখেন গদাধর। এই গদাধরই পরবর্তীকালের শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস। এটি তাঁর আশ্রমী নাম।

বাল্যশিক্ষার ব্যবস্থা হলেও শিক্ষার প্রতি গদাধরের মনোযোগ ছিল না। তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভ তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। অপরদিকে শৈশবেই তাঁর মধ্যে প্রকাশ পায় দিব্যভাব। তাঁর ছিল অসাধারণ স্মৃতিশক্তি; কথিত আছে রামায়ণ-মহাভারতের পালা একবার শুনেই তিনি মুখস্থ আওড়াতে পারতেন। পিতার নিকট থেকে তিনি ধর্মীয় শ্লোক শিখেছিলেন; গ্রামের কথকদের নিকট থেকে শেখেন  রামায়ণমহাভারত ও পুরাণের কাহিনী এবং পুরীগামী তীর্থযাত্রীদের নিকট থেকে শেখেন ধর্মগীতি।

পিতার মৃত্যুর পর অগ্রজ রামকুমার কলকাতার ঝামাপুকুরে নিজস্ব টোলে গদাধরের পড়ার ব্যবস্থা করেন। পরে রাণী রাসমণি প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে রামকুমার পূজার ভার পেলে গদাধর অগ্রজের সঙ্গে মন্দিরে স্থান পান। অল্পকাল পরে রামকুমারের মৃত্যু হলে পূজার দায়িত্ব পড়ে গদাধরের ওপর। এখানে কালীমূর্তির পূজায় ভক্তিগীতি গাওয়ার সময় তিনি প্রায়শই অচেতন হয়ে পড়তেন। কালক্রমে এখানেই কালীসাধনায় তাঁর সিদ্ধিলাভ ঘটে। তিনি স্ত্রী সারদা দেবীকে আধ্যাত্মিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ করেন, যা অচিরেই তাঁকে ‘আধ্যাত্মিক জননী’ পদে উন্নীত করে। এভাবে গদাধর সর্বব্যাপিণী চৈতন্যরূপিণী দেবীর দর্শন লাভ করেন।

সাধনমার্গ থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে গদাধরকে নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতায়, কিন্তু তাতে তেমন ফলোদয় হয়নি; সাধনমার্গ ব্যতীত জাগতিক শিক্ষার প্রতি তাঁর আকর্ষণ বিন্দুমাত্র বৃদ্ধি পায়নি। ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের পুরোহিত নিযুক্ত হন।

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস

এতে তাঁর কালীসাধনার সুযোগ পান। তিনি দাবি করতেন, দেবী কালীর হাতেই তাঁর শিক্ষা শুরু হয় এবং সকল দেবদেবীর একত্ব সম্পর্কে তিনি বিশ্বমাতার নিকট থেকে ধারণা লাভ করেন। তাঁর বারো বছরের তপস্যা জীবনে তিনি দুজন গুরুর দীক্ষা লাভ করেন। তাঁরা হলেন ভৈরবী ব্রাহ্মণী ও তোতাপুরী। ভৈরবী তাঁকে তান্ত্রিক সাধনা সম্পর্কে শিক্ষা দেন এবং তোতাপুরী শিক্ষা দেন বৈদান্তিক সাধনা সম্পর্কে। দীক্ষা লাভের পর তাঁর নাম হয় শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস। একই সঙ্গে রামকৃষ্ণ বৈষ্ণব সাধনায়ও সিদ্ধিলাভ করেন।

রামকৃষ্ণ শুধু হিন্দু ধর্মমতভিত্তিক সাধনায়ই আবদ্ধ থাকেননি, তিনি  ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের আরাধনা পদ্ধতিকেও জানার চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে তিনি  হযরত মুহাম্মাদ (স.) ও  যিশুখ্রিস্ট প্রবর্তিত ধর্মীয় ধারা পর্যবেক্ষণ করেন। এভাবে সমুদয় ধর্মসাধনার মাধ্যমে রামকৃষ্ণ ঈশ্বরকে উপলব্ধি করেন। তাঁর মতে সকল ধর্মেই জীবনের উদ্দেশ্য ঈশ্বর উপলব্ধি। ধর্মসমূহের পথ ভিন্ন হলেও সকলেরই উদ্দিষ্ট এক ও অভিন্ন ঈশ্বরের নৈকট্য লাভ। তাঁর ভাষায় ‘সকল ধর্মই সত্য, যত মত তত পথ’, অর্থাৎ ধর্মীয় মত ও পথ ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য ও গন্তব্য এক। তিনি প্রথাগত সন্ন্যাসীদের মতের সঙ্গে একমত ছিলেন না বা তাঁদের মতো পোশাকও পরতেন না। এমনকি তিনি স্ত্রী সারদা দেবীকে সাক্ষাৎ জগদম্বা জ্ঞানে পূজা করতেন।

শ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন লোকগুরু। ধর্মের কঠিন তত্ত্বকে সহজ করে বোঝাতেন তিনি। ঈশ্বর রয়েছেন সকল জীবের মধ্যে, তাই জীবসেবাই ঈশ্বরসেবা- এই ছিল তাঁর দর্শন। ধর্মীয় সম্প্রীতিতে গভীর বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। তাঁর প্রধান শিষ্য স্বামী  বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২) তাঁরই ধর্মীয় আদর্শ জগদ্বাসীকে শুনিয়ে গেছেন, যার ফলে রামকৃষ্ণের এই জীবসেবার আদর্শ অর্থাৎ মানবধর্ম আজ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।

রামকৃষ্ণের উদার ধর্মীয় নীতির প্রভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও ভাবাদর্শে মোহগ্রস্ত অনেক শিক্ষিত যুবক ভারতীয় আদর্শে ফিরে আসেন। তিনি যেমন বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষের কাছে যেতেন, তেমনি ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গও তাঁর নিকট আসতেন। শিবনাথ শাস্ত্রী, কেশবচন্দ্র সেন, মহেন্দ্রনাথ সরকার, গিরিশচন্দ্র ঘোষসহ আরও অনেক স্বনামধন্য ব্যক্তি তাঁর সংস্পর্শে এসেছিলেন।

রামকৃষ্ণের সাধনাস্থান দক্ষিণেশ্বর এখন অন্যতম তীর্থস্থান। তাঁর মতে ঈশ্বরলাভ জীবনের পরম উদ্দেশ্য। আর এজন্য গভীর নিষ্ঠা নিয়ে সাধনা করতে হয়। শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত নামক গ্রন্থে তাঁর উপদেশাবলি বিধৃত হয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে আলোচনা করে ফরাসি মনীষী রমাঁরলাঁ রামকৃষ্ণ সম্পর্কে এক বৃহদাকার জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। সাহিত্যিক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ সাহিত্যসমাজে বিশেষভাবে সমাদৃত। শ্রীরামকৃষ্ণলীলাপ্রসঙ্গ শ্রীরামকৃষ্ণের ওপর অপর একখানি প্রামাণ্য জীবনীগ্রন্থ।

রামকৃষ্ণ ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ আগস্ট কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি একদল নিবেদিত তরুণ সন্ন্যাসী রেখে যান, যাঁরা পরবর্তীকালে ‘রামকৃষ্ণ মতবাদ’ গড়ে তোলেন। তাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন বিবেকানন্দ স্বয়ং।  [পরেশচন্দ্র মন্ডল এবং অনিল বরণ রায়]

 যত মত তত পথ। সব ধর্মের সার কথাটি এমন সহজ করে আর কেউ বলে যেতে পারেননি। যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণ যেন ধর্ম-সমুদ্র মন্থন করেই তুলে দিয়েছিলেন এ অমৃতবাণী। তবে এ শুধুই তাঁর কথার কথা নয়। জীবন দিয়ে উপলব্ধি করা সত্য। সেই সত্যের কাছে পৌঁছাতে বিভিন্ন ধর্মমতে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন ঠাকুর। এমনকী গ্রহণ করেছিলেন ইসলাম ধর্ম।

   শ্রীরামকৃষ্ণের বিপুল কর্মকাণ্ডের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের দিকটি তুলনায় স্বল্পালোচিত। তবে সাধনমার্গের এ পথেও হেঁটেছিলেন ঠাকুর। জানা যায়, ১৮৮৬-৮৭ সাল নাগাদ  ইসলাম সাধনায় মনোনিবেশ করেন ঠাকুর। গুরু হিসেবে বেছে নেন গোবিন্দ রায়কে। নাম শুনে হিন্দু মনে হলেও তিনি ছিলেন ইসলামে দীক্ষীত। তাঁর পূর্বজীবন সম্বন্ধে যা জানা যায়, তাতে তিনি ছিলেন ক্ষত্রিয় সন্তান। পরে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সে ধর্ম গ্রহণ করেন। নাম হয় ওয়াজেদ আলি খান। এই গোবিন্দ রায়ের কাছেই ইসলাম মতে দীক্ষা নেন ঠাকুর। মন্দির চত্বরে তাঁকে দেখেই ঠাকুর মুগ্ধ হন। পরে তাঁর কাছেই দীক্ষা নেন। শিয়া, সুন্নি ও সুফি- মুসলমানদের এই তিন ভাগের মধ্যে গোবিন্দ রায় ছিলেন সুফি মতের সাধক। সুফি মত অনেকটাই হিন্দু বেদান্তের আদর্শের কাছাকাছি। এই মতেই দীক্ষা নেন ঠাকুর, কলমা বা আল্লা ব্যতীত কেউই উপাস্য নেই-এই মন্ত্র গ্রহণ করেন। সেই সময় মন্দিরে পুজার্চনা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এমনকী হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি বা ছবির দিকেও তাকাতেন না। সাধারণ অহিন্দু দর্শনার্থীর মতো মন্দিরের বাইরেই বসবাস করতেন। প্রসঙ্গত, দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরের বাইরেই আছে গাজীপীরের স্থান। কথিত আছে এই গাজিপীর স্বপ্নে দর্শন দিয়েছিলেন স্বয়ং রাসমণিকে। পরে রানিমা তাঁর স্থানে বাতি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।


ইসলাম গ্রহণ প্রসঙ্গে কথামৃতে ঠাকুর নিজে জানিয়েছেন, ইসলাম সাধনায় তিনি এতটাই তন্ময় ছিলেন যে, হিন্দু দেবদেবীর দিকে দেখতে মনও চাইত না। সে সময় গোমাংস ভক্ষণেরও সাধ জেগেছিল ঠাকুরের। যদিও রানি রাসমনির জামাই মথুরমোহনের অনুরোধে সে কাজ তিনি করেননি। কিন্তু নিয়মিত নমাজ পড়তেন। মসজিদে যেতেন। কথামৃতকার ঠাকুরের মুখের কথা তুলে ধরেছেন এইভাবে, ‘গোবিন্দ রায়ের কাছে আল্লা মন্ত্র নিলাম। কুঠিতে প্যাঁজ দিয়ে রান্না ভাত হলো। খানিক খেলুম।’ অন্যত্র বলছেন, ‘…বটতলায় ধ্যান করছি, দেখালে একজন দেড়ে মুসলমান সানকি করে ভাত নিয়ে সামনে এলো। সানকি থেকে ম্লেচ্ছদের খাইয়ে আমাকে দুটি দিয়ে গেল। মা দেখালেন, এক বই দুই নাই। সচ্চিদানন্দই নানা রূপ ধরে রয়েছেন। তিনিই জীবজগৎ সমস্তই হয়েছেন। তিনিই অন্ন হয়েছেন।’

তিনদিন ইসলাম ধর্মে গভীর সাধনা করেন ঠাকুর। সে সময় ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনও চিন্তা তিনি মাথায় রাখেননি। এবং অচিরেই এ পথে সিদ্ধিলাভ করেন। ঠাকুরের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ নিয়ে সাল তারিখের মতভেদ আছে। বিভিন্ন গ্রন্থে আলাদা আলাদা সময়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিভিন্ন ঘটনাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা স্মৃতিচারণায়। স্বামী প্রভানন্দের ‘শ্রীরামকৃষ্ণজীবনে ইসলাম’ বইটিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়েছে। ঠাকুরের ইসলাম গ্রহণের কথা লিখেছেন স্বামী নির্বেদানন্দও। কথিত আছে, তিনদিনের সাধনার পর, এক সৌম্যদর্শন ফকিরের সঙ্গে দেখা হয় ঠাকুরের। দু’জনেই দু’জনকে দেখে বিভোর হয়ে যান। ঠাকুরের মনে হয় তিনি মহম্মদের দর্শন পেয়েছেন। যাই হোক, এর আগে অদ্বৈতসাধনমার্গে সিদ্ধিলাভ করে যে অনুভূতিতে পৌঁছেছিলেন, ইসলাম গ্রহণ করেও সেই একই অনুভবে পৌঁছান ঠাকুর। এরপর খ্রিস্ট ও বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেও তিনি সিদ্ধিলাভ করেন। সব ধর্মের পথ পরিক্রমায় মেতেছেন বলেই তিনি এক সহজে বলতে পেরেছেন সর্বধর্ম সমন্বয়ের কথাটি যা সনাতন ভারতের ঐতিহ্য। ঠাকুরের ভারতবর্ষ তাই সেই উদার ও ঐতিহ্যের ভারতবর্ষ।

 তথ্য সূত্র https://www.sangbadpratidin.in/religion/ramakrishna-embraced-sufi-mysticism-islamic-tenets/

ও  http://bn.banglapedia.org/index.php

 


 



 

 



 


Saturday, September 5, 2020

Post # 999 Bengali Amarchitra Katha 075

                                                                  ডাউনলোড করুন

 

 

 

 

     


                                  


 

 
 

 
 ৬৭ পর ৭৫ নং অমর চিত্র কথা পোস্ট করা হোল। ৬৮-৭৪ নং আমি কোনদিন বাংলায় দেখিনি ।

 
 
 
 
 
 
 
 
দীপক রাগে যদিবা বহ্নিশিখা ছড়িয়েও পড়তো, মেঘমল্লার গেয়ে বৃষ্টি আনতেও ভুলতেন না তিনি। বিভিন্ন ‘রাগ’ এর ওপর তার ছিলো অদ্ভুত এক নিয়ন্ত্রণ, সঙ্গীতশিল্প যেন নিজেকে সঁপে দিয়েছিলো সঠিক নিয়ন্ত্রকের হাতেই। হ্যাঁ, এই নিয়ন্ত্রকই হচ্ছেন তানসেন, সম্রাট আকবরের সভার নবরত্নের একজন। তানসেন রত্ন হয়ে সুশোভিত নয়, সুরারোপিত করে রেখেছিলেন সভাকে। উত্তর ভারতীয় উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের তানসেন ছিলেন এক অতুলনীয় মহারথী।
 

তানসেনের বাবা ছিলেন একজন কবি, কবি মুকুন্দ মিশ্র। তিনি ছেলের নাম রাখেন রামতনু মিশ্র, মতান্তরে তনু মিশ্র। ছোটবেলায় এ নামেই মানুষ তাকে ডাকতো।

সঙ্গীত দিয়ে তিনি নাকি আন্দোলন জাগাতেন বৃক্ষ ও পাথরে, এই সঙ্গীতই ছিল তার তীব্র শক্তির উৎস। তার এই সঙ্গীতের জন্যই হেলে পড়েছিলো বিহাটের গ্রামের সেই শিবমন্দিরটি– অন্তত তার ভক্তরা তাই জানে এবং মানে।

তানসেনকে নিয়ে সিনেমা

১৯৪৩ সালে সঙ্গীতশিল্পী তানসেনকে নিয়ে বলিউডে ‘তানসেন’ নামে একটি সিনেমা মুক্তি পায়। সিনেমাটির পরিচালক ছিলেন জয়ন্ত দেশাই। এতে তানসেনের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন কে এল সাইগল। পন্ডিত ইন্দ্র রচিত গানে সিনেমাটির সম্পূর্ণ সঙ্গীত প্রযোজনার দায়িত্বে ছিলেন ক্ষেমচাঁদ প্রকাশ।

ছেলেবেলায় তানসেন

এই গোয়ালিয়রেই থাকতেন তানসেন, image source: ixigo.com

চারশ বছরেরও আগে গোয়ালিয়র নামক এক গ্রামে বাস করতেন বেশ স্বচ্ছল বিত্তবান এক কবি ও তার স্ত্রী, নাম তার মুকুন্দ মিশ্র। সব রূপকথার রাজাদেরই যেমন থাকে, মুকুন্দ মিশ্রেরও ছিল সেই একই সমস্যা। বুঝতেই পারছেন কী হতে পারে তা? ঠিক ধরেছেন, তাদের কোনো সন্তান ছিল না এবং এ নিয়ে নিঃসন্তান দম্পতির দুঃখের কোনো শেষ ছিল না। এক বন্ধুর পরামর্শে মিশ্র দম্পতি গেলেন তখনকার বিখ্যাত দরবেশ হযরত মোহাম্মদ গাউসের কাছে। গাউস মুকুন্দ মিশ্রের হাতে বেঁধে দিলেন এক পবিত্র সুতো আর এই আশীর্বাদ করলেন যে অতিসত্ত্বরই তাদের এক পুত্রসন্তান হবে। কিছুদিনের মধ্যেই গাউসের ভবিষ্যদ্বাণী ফলে গেল। জন্ম নিলেন তানসেন। পিতা তার জন্য নিযুক্ত করলেন শিক্ষকদের। কিন্তু ছেলের তো পড়াশোনায় মন নেই, তার মন পড়ে থাকে জঙ্গলে, যেখানে সে নিত্য-নতুন পশুপাখির সুর নকল করে! হ্যাঁ, এই ছিল তার প্রিয় খেলা।

হরিদাসের কাছে সঙ্গীতশিক্ষা

গুরু হরিদাস,

একদিন হলো কী, জঙ্গলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল এক গানের দল। দুষ্টু তানসেন তাদের ভয় পাইয়ে দেওয়ার জন্য শুরু বাঘের মতো করে ডাক! সে ডাক এতোই সত্যি মনে হচ্ছিল যে গায়কেরা অনেক ভয় পেয়ে গেলেন। তখন তানসেন তাদের সামনে আসলো, দলের নেতা তো তার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি অনেক প্রশংসাও করলেন তার গর্জনের! এই দলনেতাটি আর কেউ নয়, ছিলেন তখনকার বিখ্যাত এক সঙ্গীতশিক্ষক হরিদাস। হরিদাস তানসেনকে তার শিষ্য করে নিতে চাইলেন। মুকুন্দ মিশ্রকে গিয়ে এ ব্যাপারে অনেক বোঝালেনও তিনি। তানসেনের মা অনেক মন খারাপ করলেন ছেলেকে এত দূর পাঠাবেন বলে, তবে শেষপর্যন্ত হরিদাসের সঙ্গে তানসেন বৃন্দাবন গেলেন সঙ্গীতশিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশে।

১০ বছর ধরে একনিষ্ঠভাবে সঙ্গীতশিক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত রাখলেন তানসেন। হরিদাসও তার মতো শিষ্য পেয়ে ঢেলে দিলেন তার সকল বিদ্যা। ভিত্তি নিয়মগুলো থেকে শুরু করে সিদ্ধহস্তে তানপুরা বাজানো, সা রে গা মা পা থেকে শুরু করে সঙ্গীতের নানা রাগ আয়ত্ত করলেন তানসেন। তিনি শিখলেন কীভাবে সঙ্গীতের বিভিন্ন রাগ বদলে দেয় মানুষের মনের অবস্থা! প্রকৃতি ও মানবমনের সাথে সঙ্গীতের নিগূঢ় সম্পর্ক অনুভব করতে লাগলেন তানসেন। একটি রাগ কীভাবে কাউকে আনন্দে পর্যবসিত করতে পারে আর পরক্ষণেই বিপরীত একটি রাগ কীভাবে চোখে জল এনে দিতে পারে- এ সবকিছু যেন তানসেনের নখদর্পণে এসে গিয়েছিল। বলা বাহুল্য, ইতিহাসের পাতায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গুরু-শিষ্যের মধ্যে হরিদাস-তানসেনের নামও উজ্জ্বল হয়ে থাকবে!

আরও এক গুরুর সাহচর্য

তানসেনের বাবা অসুস্থ হবার খবর শুনে তানসেন বৃন্দাবন থেকে ফিরে আসলেন বাড়িতে। মুকুন্দ মিশ্র মারা গেলেন এবং মৃত্যুশয্যায় তানসেনকে বলে গেলেন হযরত গাউসের কাছে গিয়ে সঙ্গীতশিক্ষা গ্রহণের জন্য। বাবার মৃত্যুর পর তানসেন মায়ের সেবায় নিয়োজিত হলেন এবং কিছুদিন পর তার মা-ও মারা গেলেন। পিতৃ-মাতৃহীন তানসেন এখন গাউসের কাছে যাবেন মনস্থির করলেন. কিন্তু তার আগে বর্তমান গুরু হরিদাসের সম্মতি তো লাগবে! হরিদাস তানসেনকে বললেন যে তার দরজা সবসময়ই তানসেনের জন্য খোলা থাকবে এবং সে গাউসের কাছে বিদ্যার্জনের জন্য যেতে পারে।

তানসেন গাউসের কাছে গিয়ে সঙ্গীতশিক্ষা আরও ঝালিয়ে নিতে লাগলেন। তিন বছর ধরে তিনি গাউসের ছাত্রত্ব গ্রহণ করেন। গাউস তানসেনকে গোয়ালিয়রের অন্যান্য সঙ্গীতশিল্পী ও সঙ্গীতবিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, সঙ্গীতজগতে তানসেনের চেনাজানা বাড়তে থাকে গাউসের মাধ্যমে। গোয়ালিয়রের রাজার সাথেও গাউস তাকে পরিচয় করিয়ে দেন এবং একসময় তারা বেশ ভাল বন্ধু হয়ে উঠেন।

ভারতীয় ডাকটিকিটে তানসেন, image source: istampgallery.com

পরিবারজীবনে তানসেন

রাজপ্রাসাদে যাতায়াত করতে করতে রাজার এক পরিচারিকার প্রেমে পড়লেন তানসেন। মেয়েটির নাম ছিল ‘হুসানী’, যার অর্থ ‘সুন্দরী’। তারা দু’জনে বিয়ে করলেন, তানসেন ধর্মান্তরিত হলেন। পড়ে তানসেন আরও একবার বিয়ে করেন এবং সবমিলিয়ে তার পাঁচ সন্তান ছিল।

খ্যাতির প্রথম ধাপ

মোহাম্মদ গাউস মারা যাবার আগে তার সকল সম্পত্তি তানসেনের নামে দিয়ে গেলেন এবং পরিবার নিয়ে তানসেন সেখানেই বাস করতে লাগলেন। একদিন রেওয়া থেকে এক দূত এসে বললো যে রাজা রামচন্দ্র তানসেনকে তলব করেছেন। খ্যাতির প্রতি এটিই ছিল তানসেনের প্রথম যাত্রা। রাজা তানসেনের সঙ্গীতপ্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রাসহ আরও বহু মহামূল্যবান পুরষ্কারে তাকে ভূষিত করলেন।

মেঘমল্লারে ডাকা বৃষ্টি, image source: saketjain.com

তানসেন নিজেই যখন উপহার!

একবার সম্রাট আকবর রেওয়াতে বেড়াতে এলেন এবং রাজা রামচন্দ্র তানসেনের গান দিয়ে সম্রাটের মনোরঞ্জন করলেন। এতে অবশ্য রাজা রামচন্দ্রের লাভের চাইতে ক্ষতিই হলো বেশি! কারণ আকবর চেয়ে বসলেন খোদ তানসেনকেই! যদিও রামচন্দ্র তানসেনকে হারাতে চাচ্ছিলেন না, তারপরও মহাপরাক্রমশালী সম্রাটের সাথে রাজা আর কী করে পারবেন? নিমরাজি হয়েই রাজ উপহার হিসেবে তানসেনকে পাঠালেন আকবরের সভায়। আর সে সভায় গিয়ে তানসেনের খ্যাতি যেন আকাশ ছুঁতে লাগলো! এতদিন যেন ঠিক ক্ষেত্র পাননি তানসেন, আকবরের সভা তাকে সেই ক্ষেত্রটি দিল। শোনা যায়, তানসেনের রেওয়াজকক্ষে সাতটি সরস্বতীমূর্তি ছিল আর তিনি যখন সা রে গা মা পা ধ্বনি দিয়ে গলা সাধতেন, একেকবার একেকটি সরস্বতীমূর্তি থেকে ধ্বনিগুলো আসছে বলে মনে হতো!

এই গুরু-শিষ্যকে আজও একসাথেই স্মরণ করা হয়, image source: liveindia.live

রাতের বেলা তানসেন আকবরকে এক সুমধুর রাগের মাধ্যমে ঘুম পাড়াতেন এবং সকালে আরেক অপূর্ব রাগ গেয়ে শান্ত ভঙ্গিতে আকবরকে ঘুম হতে জাগাতেন। সম্রাট আকবরের দৈনন্দিন ছকে তানসেনের নাম গাঁথা হয়ে গিয়েছিল। তাই সম্রাটের সভার নবরত্নে তানসেন থাকবেন, এ কোনো অদ্ভুত কথা ছিল না!

কথিত আছে তানসেন যখন গাইতেন, সকল পশুপাখি তখন তার গান শুনতে চলে আসতো! প্রকৃতির সাথে এমনই সুরের বন্ধনে নিজেকে বেঁধেছিলেন তানসেন! সম্রাটের যখনই অশ্ব কিংবা হস্তী আরোহণ করবার সময় আসতো, তখন তানসেনই তাদের গান গেয়ে শান্ত করতেন এবং সম্রাট নিরাপদে তাতে আরোহণ করতেন।

আকবর-তানসেন

হিন্দুস্তানী সঙ্গীতের এক যাদুকর তানসেন, দিনে দিনে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিলো সম্রাট আকবরের রাজসভা এবং তার বাইরেও। সফলতা যেখানে চূড়ান্ত, সেই সফলতা থেকে ঈর্ষাকাতর ব্যক্তিদেরকে দূরে রাখা যায় না। তানসেনের ক্ষেত্রেও রাখা যায়নি। অন্য সভাসদেরা তানসেনের খ্যাতি-জনপ্রিয়তায় যেন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন আর ফন্দি আঁটতে লাগলেন কী করে তানসেনের জনপ্রিয়তা ধুলিস্যাৎ করে দেওয়া যায়। তো তারা করলেন কি, এক গুজব ছড়িয়ে দিলেন তানসেনের নামে। তানসেন তার সুরমহিমা দিয়ে একটি নিভে যাওয়া প্রদীপেও আলোকসঞ্চার করতে পারেন- এই ছিলো গুজবটি। গুজবটি পুরোপুরি গুজব ছিলোও না। তানসেন তা করতে পারতেন, কিন্তু যে রাগ গাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রদীপে আলো আসতে পারে, সেই রাগ গেয়েই এতো বেশি তাপ উৎপাদিত হয় যে তাতে গায়ক নিজেই জ্বলে-পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবেন! এই তো চেয়েছিলো তানসেনের শত্রুরা। এক ঢিলে দুই পাখি সাবারের মতো তানসেনের খ্যাতির সাথে সাথে খোদ তানসেনকেই ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া।

আকবরের সভায় তানসেন, image source: madhu ki diary

তানসেন যখন দ্বিধায় ভুগছেন, সমাধান নিয়ে এলেন তার সুযোগ্য কন্যা। তিনি তানসেনকে বললেন রাগ মেঘমল্লারের কথা, যেদিন রাজসভায় তানসেন সুরের পরীক্ষা দেবেন দীপক রাগ গেয়ে। তার অব্যবহিত পরেই তার কন্যা গ্রামের দিকতায় গিয়ে শুরু করবেন রাগ মেঘমল্লার, বৃষ্টি নেমে আসবে, শীতল হবে ভূমি। যেই ভাবা সেই কাজ, তানসেন কন্যাকে শিক্ষা দিতে লাগলেন রাগ মেঘমল্লারের। তানসেনের কন্যাও তারই মতো সঙ্গীতপ্রেমী ও পারদর্শী ছিলেন, তাই শিখে নিতে বেশিদিন লাগলো না তার।

অবশেষে এলো সেই দিন, আজ সভাসদ ও স্বয়ং সম্রাট আকবরের সামনে পরীক্ষায় নামলেন তানসেন। দীপক রাগে উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হয়ে উঠতে লাগলো চারিদিক, সব জিনিসপত্র যেন মোমের মতো গলে যাচ্ছিলো। সভায় থাকা দায় হয়ে উঠেছিলো সবার। তেলে ভর্তি হাজারো প্রদীপ জ্বলে উঠলো সভাজুড়ে, অদ্ভুত কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন তানসেন, রক্ষা পেলো তার খ্যাতি। কিন্তু এদিকে যে তানসেনের শরীরের তাপ বাঁধ মানছে না! শরীর যেন জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে তানসেনের, পূর্ব পরিকল্পনা মতো তার কন্যা গ্রামের দিকে বাজাচ্ছেন মেঘমল্লার রাগ। তিনি দৌড়ে গেলেন সেদিকে, অবিরত জলধারায় শান্ত হলো তাপ ও দীপক রাগের বিভীষিকা। প্রাণে ও খ্যাতি উভয়েই সেদিন বেঁচে রইলেন এই প্রবাদপুরুষ, তবে দীর্ঘ দুমাস অসুস্থ হয়ে বিছানায় ছিলেন। অনেক বছর আকবরের সভা আলোকিত করবার পর আনুমানিক ১৫৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল অথবা ১৫৮৯ সালের ৬ মে তিনি যখন মারা যান, আকবর তখনও তার পাশে ছিলেন।

তানসেনের সমাধি

গোয়ালিয়র গ্রামে তানসেনের সমাধি, image source: ixigo.com

গোয়ালিয়র গ্রামে তানসেনের সমাধি নিয়েও কিছু মিথ চালু আছে তার ভক্তদের মধ্যে! বক্রপাথরে তৈরি সমাধিটির খুব পাশেই রয়েছে একটি তেঁতুল গাছ। তানসেনের ভক্তরা মনে করে যে কোনো গায়ক যদি এই তেঁতুল গাছটির একটি পাতা খেয়ে তানসেনের সমাধি স্পর্শ করে, তবে সে তানসেনের আশীর্বাদপ্রাপ্ত হবে! অদ্ভুত হলেও সত্যি যে তানসেনের মৃত্যুর এত বছর পরও হিন্দুস্তানী এমনকি আন্তর্জাতিক সঙ্গীতেও তানসেন এত প্রবলভাবে বেঁচে আছেন!

তানসেন সমারোহ

তানসেনের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে প্রতি ডিসেম্বরে ভারতের মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়রে ‘তানসেন সমারোহ’ অনুষ্ঠিত হয়। দেশ-বিদেশের বহু সঙ্গীতজ্ঞ এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তানসেনের পাশাপাশি তার গুরু হরিদাস ও হযরত মোহাম্মদ গাউসকেও এই সমারোহে স্মরণ করা হয়।

তানসেন সমারোহ, গোয়ালিয়র; image source: soulSteer.com

তানসেন শুধু একজন গায়কই নন, ছিলেন একজন কবি। তিনি বহু গান বেঁধেছেন ও সেগুলোকে গেঁথেছেন বিভিন্ন সুরে। গোয়ালিয়র গ্রামে আজও তার সমাধির পাশে বড় উৎসব হয় এবং দেশ-বিদেশের সঙ্গীতপ্রেমীরা সেখানে এসে তানসেনের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

তথ্য সূত্র  https://roar.media/